গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

  ২ ঘণ্টা আগে

স্কুলের বারান্দায় প্রতিবন্ধীর ৪০ বছর, শেষ স্বপ্ন একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

দুটি পা সম্পূর্ণ অচল, একটি হাতও ঠিকমতো কাজ করে না। নেই নিজের কোনো ঘর, নেই মাথা গোঁজার ন্যূনতম নিরাপদ আশ্রয়। তবুও জীবনের নিষ্ঠুরতার কাছে হার মানেননি মাহতাব হোসেন। কারও কাছে হাত পাতেননি, সস্তা করুণার ‘ভিক্ষাবৃত্তি’কে বেছে নেননি। বরং নিজের একমাত্র সচল হাতটিকে পুঁজি করে, তীব্র আত্মসম্মানবোধ নিয়ে টানা চার দশক ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন জীবনের সঙ্গে।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের বড় ভাটড়া শেখপাড়া গ্রামের এই লড়াকু মানুষটির বর্তমান ঠিকানা—ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা। ছোট্ট একটি চকি, টুকিটাকি কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আর এক বুক অদম্য আত্মসম্মান—এই নিয়েই কেটে গেছে তাঁর জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর।

বিদ্যালয়ের বারান্দাই এখন স্থায়ী ঠিকানা: সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যখন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পাঠ নিচ্ছে, ঠিক তখনই বারান্দার এক কোণে নীরবে শুয়ে আছেন মাহতাব। শরীরের চরম অসহায়ত্বকে ছাপিয়ে তাঁর চোখে-মুখে স্পষ্ট জীবনের প্রতি এক অবিচল লড়াইয়ের দৃঢ়তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, একসময় মাহতাবের নিজের বাড়ি-ঘর, জমিজমা সবই ছিল। কিন্তু শৈশবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, সেই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে পরিবারের নিষ্ঠুর সদস্যরা তাঁর সব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেন এবং একপর্যায়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। আশ্রয়হীন মাহতাব তখন ঠাঁই নেন এই বিদ্যালয়ের বারান্দায়। সেই সাময়িক আশ্রয়ই আজ চার দশকের নির্মম বাস্তবতায় তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভিক্ষা নয়, পরিশ্রমের সম্মানে বাঁচতে চান মাহতাব: নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মাহতাব হোসেন। তিনি বলেন, ছোটবেলায় আমিও সবার মতো সুস্থ ছিলাম। ১৩ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে শরীর অচল হয়ে যায়। যখন পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়লাম, তখন পরিবারের লোকজনই আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। প্রথম দিকে আশপাশের মানুষ খাবার দিলেও একসময় তা বন্ধ হয়ে যায়। তখন বেঁচে থাকার তাগিদেই কাজ শিখি। আমি হাতপাখার হাতল, চেয়ারের হাতল আর বেল্ট তৈরি করি। এতে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে জীবন চলে। অনেকেই ভিক্ষা করতে বলেছে, কিন্তু আমি কখনো ভিক্ষা করিনি। যতদিন বাঁচব, কারও কাছে হাত পাতব না।

কথার একপর্যায়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের শেষ আকুতিটুকু প্রকাশ করে মাহতাব বলেন, "আমার শুধু একটা ছোট্ট ঘর দরকার। ঝড়-বৃষ্টি হলে স্কুলের বারান্দায় খুব কষ্ট হয়। ঝড় উঠলেই মনে হয় আজই হয়তো শেষ দিন। যদি থাকার মতো একটি ঘর পেতাম, তাহলে জীবনের শেষ সময়টা একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।"

মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত হাসিনা বেগম: পরিবার তাড়িয়ে দিলেও মাহতাবকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন স্থানীয় এক নারী। প্রায় ১৩ বছর ধরে নিভৃতে মাহতাবের দেখাশোনা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা বেগম। গভীর মানবিকতার ছোঁয়া মেশানো কণ্ঠে তিনি বলেন, "মাহতাব ভাইকে এই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট লাগে। তাঁকে দেখার মতো কেউ নেই। তাই স্বামীর সঙ্গে কথা বলে ১৩ বছর ধরে যতটুকু পারি তাঁর পাশে আছি। সময় পেলেই খাইয়ে দিই, গোসল করাই, কাপড় ধুয়ে দিই।

সমাজে মানুষের নানা কটু মন্তব্যের জবাব দিয়ে তিনি আরও বলেন, "অনেকে জিজ্ঞেস করে, এসব করতে আমার ঘৃণা লাগে না? আমি বলি, যদি মাহতাবের জায়গায় আমার নিজের সন্তান থাকত, তাহলে কি তাকে ফেলে দিতে পারতাম? যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন মাহতাব ভাইয়ের সেবা করে যাব।"

জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য: ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাকিবুল ইসলাম বলেন, "অসুস্থ হওয়ার পর পরিবার মাহতাবকে পরিত্যাগ করে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্কুলের বারান্দায় আছেন। শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন মাঝে মধ্যে তাঁকে সহযোগিতা করে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি একটি ঘরের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অন্তত জীবনের শেষ সময়ে তিনি নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানা পাবেন।"

নওগাঁ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মজনু ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, "আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় প্রতিবন্ধী মাহতাবকে যতটুকু সম্ভব ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আর্থিক ও মানসিকভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে।"

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, "মাহতাব হোসেনের বিষয়টি জানার পর প্রায় এক মাস আগে আমি সরেজমিনে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। তাঁকে প্রাথমিকভাবে দুই বান টিন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।"

উল্লেখ্য, মাহতাব হোসেনের জমিজমা লিখে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া বর্তমানে ওই ইউনিয়নে কোনো চেয়ারম্যান না থাকায় ওই ইউনিয়ন পরিষদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মাহতাব হোসেন শুধু একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী বা অসহায় মানুষের নাম নন; তিনি আত্মসম্মান, অবর্ণনীয় সংগ্রাম আর হার না মানা মানবজীবনের এক জীবন্ত প্রতীক। দুই পা ও একটি হাত অচল হয়েও তিনি কখনো সমাজকে বোঝা মনে করেননি। অথচ যে মানুষটি ৪০ বছর ধরে একটি স্কুলের বারান্দাকে আশ্রয় বানিয়ে বেঁচে আছেন, জীবনের শেষ অপরাহ্নে এসে তাঁর ইচ্ছা মাত্র একটি—মাথা গোঁজার ছোট্ট একটি ঘর।

এখন প্রশ্ন একটাই—আমাদের সমাজ, বিত্তবান মানুষ আর রাষ্ট্র কি মাহতাবের সেই শেষ স্বপ্নটুকু পূরণ করবে, নাকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই খোলা বারান্দাই হয়ে থাকবে তাঁর একমাত্র ঠিকানা?

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়