নাঈমুর রহমান সুজন

  ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক মুসলিম নগর সভ্যতার খোঁজে...

একটি প্রাচীন বন্দর নগরী; নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ছবির মতো সাজানো এক শহর। সেই শহরে মানুষের কোলাহলপূর্ণ ব্যস্ততার মধ্যে বসছে হরেক রকম পণ্যের বাজার, হচ্ছে বাণিজ্য। পণ্য বোঝাই নৌকা চলছে ঢাকার পথে, কোনটি ছুটে চলছে সুদূর দিল্লির দিকে। রাজা-মন্ত্রী লোকলস্কর নিয়ে ছুটে চলছে তাদের প্রশাসনিক কাজে। আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলে মুসল্লিরা শত ব্যস্ততা ঝেড়ে শান্ত পায়ে চলছে গম্বুজ বিশিষ্ট টেরাকোটা নকশায় সুসজ্জিত মসজিদের দিকে। বলছি প্রাচীন মোহাম্মাদাবাদ শহরের কথা। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারে অবস্থিত ভৈরব নদী তীরবর্তী প্রাচীন মোহাম্মাদাবাদ শহর। একে মসজিদের শহরও বলা হয়। চলুন ঘুরে আসি ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া এক মুসলিম নগর সভ্যতা- ‘মোহাম্মাদাবাদ’ থেকে...

৩০ জানুয়ারি ২০২৬, দিনটি ছিল শুক্রবার। আমরা ডিআরটিসি (Dawah Research Training Center) থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষার্থী মিলে প্রাচীন মোহাম্মাদাবাদ নগরী শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম। সকাল ৮টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ডিআরটিসি ক্যাম্পাস থেকে বাসযোগে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। পথিমধ্যে খেজুর বাগান ঘেরা একটি দিঘির পাশে মনোরম পরিবেশে আমরা সকালের নাশতা সেরে নিই। নাশতা শেষে আমরা আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হই। যাওয়ার পথে আমরা বাসে অন্ত্যাক্ষরী খেলছিলাম; পাশাপাশি কেউ কেউ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও হকারদের কণ্ঠ নকল করে সবাইকে আনন্দ দিচ্ছিল। সকাল ১০টার দিকে আমরা আমাদের গন্তব্য স্থল- ‘মোহাম্মাদাবাদ’ শহরে এসে পৌঁছাই। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই শহর খুব সম্ভব হোসেন শাহ বা তার পুত্র নুসরত শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইনের সময় অর্থাৎ ৮০০ হিজরি বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই শহরের গোড়াপত্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখানে এ পর্যন্ত ১৫টি প্রত্নতত্ত্ব স্থাপনা পাওয়া গেছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই সমৃদ্ধ শহর আজ আর নেই। বর্তমানে কিছু সংস্কারকৃত মসজিদ, মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, কবরস্থান এবং কিছু স্মৃতিচিহ্ন ছাড়া সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সুলতানি আমলের ইতিহাস এই অঞ্চলের ঐতিহ্য এবং তৎকালীন মুসলিমদের স্থাপত্যশৈলী স্বচক্ষে অবলোকন করতে এবং এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ থেকে আমরা বেছে নিই প্রাচীন মোহাম্মাদাবাদ নগরী।

মোহাম্মদাবাদে আমাদের যাত্রা শুরু হয় একটি কবরস্থান পরিদর্শনের মাধ্যমে, এটির নাম ‘খড়ের দিঘি কবরস্থান’। ধারণা করা হয়, এটি সুলতানি আমলের কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের কবর ছিল।

এরপর আমরা পরিদর্শন করি নুনগোলা মসজিদ। এটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট ছোট একটি মসজিদ। এই মসজিদটি মাটির নিচে ধ্বংসাবশেষ হিসেবে চাপা পড়ে ছিল। পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি অনুসন্ধান করে মসজিদের কাঠামো ঠিক রেখে সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী সংস্কার করে পরিপূর্ণ রূপ দান করে। এতো সুচারুরূপে মসজিদটিতে সুলতানি আমলের আবহ দেওয়া হয়েছে, শুরুতে আমরা একে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো মূল মসজিদটি ভেবেছিলাম। মসজিদটি দেখে আমরা বেশ অভিভূত হয়েছিলাম। কিন্তু সংস্কারের তথ্য জানার পর আমাদের মনে একটি আক্ষেপ জন্ম নেয়। মনে মনে ভাবছিলাম, আহ! যদি সেই ৬০০ বছরের পুরোনো কোনো মসজিদ দেখতে পেতাম! সেই অপেক্ষা অবশ্য বেশি দীর্ঘ হয়নি; একটু পরেই বলছি সেই কথা।

নুনগোলা মসজিদের কিছুটা পশ্চিমেই রয়েছে শুকুর মল্লিক মসজিদ। এটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই শহরের সবচেয়ে ছোট মসজিদ। শুকুর মল্লিক মসজিদ থেকে গ্রামের মেঠো পথ ধরে খানিকটা এগিয়ে গেলে দেখা মিলে পীরপুকুর মসজিদের। এটি বেশ বড় একটি মসজিদ। এই মসজিদের মিম্বারের নকশাটা একটু ভিন্নধর্মী। আমরা সাধারণত মসজিদের মিম্বার হিসেবে একটা চেয়ার বা এ জাতীয় কিছু দেখে থাকি; কিন্তু পীরপুকুর মসজিদে কেন্দ্রীয় মিহরাব থেকে কিছুটা উত্তরে এবং বেশ উঁচুতে অবস্থিত। ফলে মিম্বরে উঠতে হয় সিঁড়ি দিয়ে। এই মসজিদটি পরিপূর্ণ রূপে সংস্কার করা হয়নি; দেয়ালের একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত মসজিদটির অবকাঠামো লক্ষ্য করা যায়।

পীরপুকুর মসজিদ থেকে একটু দুরে রয়েছে গলাকাটা মসজিদ। মসজিদটির নাম ‘গলাকাটা’ কেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে লোক মুখে নানা জনশ্রুতি শোনা যায়। ১৯৯৩ সালে প্রত্নস্থল খননের ফলে এই মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হয় এবং পরবর্তীতে তা সংস্কার করা হয়। এই মসজিদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এই মসজিদের অভ্যন্তরে দুইটি বহুভুজাকার পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। এই শহরের মসজিদগুলোতে সাধারণত এধরনের স্তম্ভ দেখা যায় না; কেননা এ অঞ্চলে পাথর সহজলভ্য ছিল না বলে সাধারণত ইট দিয়ে স্তম্ভ তৈরি করা হতো।

গলাকাটা মসজিদের পাশেই রয়েছে জোড় বাংলা মসজিদ। এই মসজিদের চারকোণে চারটি অষ্টকোণাকার বুরুজ (উঁচু মিনার বা স্তম্ভ সদৃশ) রয়েছে, যা সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। মসজিদটির চারপাশে বারান্দা রয়েছে এবং উত্তর পাশে প্রবেশ পথের কিছু অংশ আজও অবশিষ্ট রয়েছে। ধারণা করা হয়, মসজিদটি সুলতান গিয়াস উদ্দীন মাহমুদ শাহের শাসনামলে নির্মিত হয়।

জোড় বাঙলা মসজিদ থেকে আমরা চলে যাই গোড়ার মসজিদ। এটিই সেই মসজিদ যেটি গম্বুজের অংশ ব্যতীত প্রায় সম্পূর্ণ মসজিদ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। এই মসজিদ দেখে আমাদের সেই আক্ষেপও ঘুচে যায়। এই মসজিদের দেয়ালে সুলতানি আমলের অনবদ্য টেরাকোটা এবং পশ্চিমের দেয়ালে তিনটি বহুভাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত মিহরাব লক্ষ্য করা যায়। এই মসজিদে কেন্দ্রীয় মিহরাবের উপরের দিকে পোড়ামাটির চমৎকার কলস-নকশা লক্ষ্য করা যায়। এই মসজিদেই আমরা জুমার সালাত আদায় করি। সালাত শেষে সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় যেখানে কুরআন থেকে তিলাওয়াত এবং গজল পরিবেশন করা হয়। সেই সঙ্গে এখানে আয়োজন করা হয় ‘ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৌশলগত দ্বন্দ্ব: গণতন্ত্র বনাম খেলাফত - বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনটি সময়োপযোগী’ শীর্ষক বিতর্ক প্রতিযোগিতা। যেখানে বিতর্কের দুই পক্ষই যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করে যা বেশ উপভোগ্য ছিল।

প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন এক মসজিদ আর সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে এক শিহরণ জাগানিয়া আবহের সৃষ্টি হয়েছিল। মনের কোণে বারবার উঁকি দিচ্ছিল- হয়তো সুলতানি আমলেও হয়তো এখানে নিয়মিত পাঠদান হতো, অসংখ্য মানুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল। সেই সময়টা না জানি কেমন ছিল! সেই মানুষগুলোই বা কোথায়! আহ! দুনিয়াটা সত্যিই বড় অদ্ভুত।

সারাদিন সুলতানি আমলের মসজিদের দেয়াল, বুরুজ আর মিহরাবের সংস্পর্শে মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। পর্যটক হিসেবে নয়, বরং আমরা যেন পুরোটা সময় কাটিয়েছি এই হারিয়ে যাওয়া নগরীর এক বাসিন্দা হয়ে। রাস্তা ধরে হেঁটে চলার সময় মনে হচ্ছিল- এই তো পাশ দিয়ে সুলতান তার স্বভাব সুলভ আভিজাত্যে সুসজ্জিত হয়ে দলবলসহ কোনো তুর্কি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে টক-বগ টক-বগ করে ছুটে চলছেন। দিন শেষে আমাদের সম্মুখে জীবন্ত হয়ে উঠছিল সেই শহর, সেই প্রাচীন জনপদ আর আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি।

গলাকাটা মসজিদে আসরের সালাত আদায় করে আমরা ফিরার উদ্দেশে রওনা হই। সময় যেমন অতীতকে ইতিহাসের পাতায় তুলে রেখে অবিরাম এগিয়ে চলে, আমরাও তার ব্যতিক্রম হতে পারলাম না; কেননা আমরাও তো সময়ের অমোঘ বেড়াজালে বন্দি। মোহাম্মাদাবাদের মাটিতে সারাটি দিন ভ্রমণের উপাখ্যান লিখে, অভিজ্ঞতার ক্যারাভ্যানে কিছু গল্পের কুঁড়ি তুলে, উপলব্ধির ঝুলিতে একরাশ অনুভূতি নিয়ে চললাম অতীত থেকে বর্তমানে, চললাম ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু রবি ঠাকুরের সুরে সুর মিলিয়ে বলতে হচ্ছে- ‘শেষ হইয়াও হইলনা শেষ’। আমাদের সামনে যে আরো একটা চমক অপেক্ষা করছে, তা আমরা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারিনি। ঠিক যেন ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ থেকে রোলার কোস্টারে হুট করেই আধুনিক কালে এসে পড়লাম। ফেরার পথে আমরা ঝিনাইদাহ জেলার নলডাঙ্গায় অবস্থিত মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লি. পরিদর্শন করি। মিলের প্রকাণ্ড কর্মযজ্ঞ দেখে আমরা যারপর নাই অভিভূত হয়েছি। দানবীয় সব যন্ত্রপাতি, মিলের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ততা এবং আখের রসের কড়া গন্ধে সকলে বেশ মুগ্ধ হই। এছাড়া আরেকটা মজার বিষয় হলো, এতো বিশাল যন্ত্রপাতি চলছে মিলের ভিতরেই উৎপাদিত বিদ্যুতের মাধ্যমে। আপনাদের আরেকটু ভেঙ্গে বলি- আখ থেকে রস বের করার পর যে উচ্ছিষ্ট থাকে, তা পুড়িয়ে তাপশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সুগার মিলটিতে বিদ্যুৎ সরবারহ করা হয়।

সুগার মিল পরিদর্শন শেষে মাগরিবের সালাত আদায়ের মাধ্যমে আমাদের এই রোমাঞ্চকর শিক্ষা সফরের সূর্য অস্ত যায়।

লেখক,

শিক্ষার্থী, আল ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়