আল মামুন

  ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৪

বিভাজন ভুলে গড়ে তুলুন ভ্রাতৃত্ববোধ

বাংলাদেশ, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি, হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। এখানে একসময় ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সব মানুষ মিলেমিশে ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বিভাজন আমাদের সমাজের গায়ে বিষাক্ত ছায়া ফেলেছে। আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- এই বিভাজন, হিংসা এবং বিদ্বেষকে দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা।

স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পার হলেও আমরা এখনো রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বিভাজনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা যেখানে আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ের রাজনীতি আমাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতা, স্বার্থ এবং মতাদর্শের লড়াই আমাদের সমাজকে টুকরো টুকরো করেছে।

রাজনৈতিক বিভাজন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভেদ তৈরি করেছে। আমরা আজ নিজেদের পরিচয় দিচ্ছি দলীয় ব্যানারে, জাতীয় পরিচয়ের বদলে। পরিবার, বন্ধুত্ব, সামাজিক সম্পর্কেও এই বিভাজন বিষ ঢেলে দিচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সবাই এক ছিলাম, একটি পতাকার নিচে, একটি স্বপ্নের জন্য। সেই ঐক্যই আমাদের বিজয় এনে দিয়েছিল। ধর্মীয় বিভাজনও আজ আমাদের সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে। বাংলাদেশ, যার ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সেখানে ধর্মের নামে হিংসা এবং বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। অথচ ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্ট ধর্ম- সব ধর্মের মূল শিক্ষাই হলো- শান্তি, মানবতা আর সহাবস্থান।

বিভাজন এবং হিংসার ফলাফল কখনোই শুভ হয় না। এর ফলে সমাজে স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক সহিংসতা আমাদের রাস্তা-ঘাটকে রক্তাক্ত করে, আর ধর্মীয় বিদ্বেষ আমাদের সমাজের শান্তি বিনষ্ট করে। এসবের ফলে জাতির অগ্রযাত্রা স্তব্ধ হয়ে যায়। যখন একটি সমাজে অবিশ্বাস এবং বিদ্বেষ জন্ম নেয়, তখন মানুষ পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়। পারস্পরিক সহযোগিতা আর সহমর্মিতার বদলে সেখানে বিরাজ করে সন্দেহ আর শত্রুতা। এর ফলে সমাজে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধ ধসে পড়ে। আমাদের নতুন প্রজন্ম বিভেদের এই অন্ধকার দেখে হতাশ হয়, তাদের মধ্যে বেড়ে ওঠে অনিশ্চয়তা এবং ক্ষোভ। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং শান্তির জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক বিভাজন ভুলে আমাদের একতাবদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা যে ঐক্য দেখেছিলাম, সেই চেতনাকেই আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।

রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকবেই। কিন্তু সেই ভিন্নতা যেনো হিংসা এবং সহিংসতার জন্ম না দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। ধর্মীয় সহাবস্থান আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই মিলে একসঙ্গে এই দেশ গড়েছি। ধর্মীয় বিভেদ ভুলে আমাদের আবার সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্যে ফিরে যেতে হবে। শিক্ষা, পরিবার এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে ধর্মের প্রকৃত বার্তা- শান্তি, মানবতা এবং সহমর্মিতা- তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাজন এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে ঐক্য, সম্প্রীতি এবং শান্তির বার্তা প্রচার করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষ যেন বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই একই দেশের সন্তান। এই দেশ আমাদের সবার, এই মাটি আমাদের সবার আশ্রয়। বিভেদের দেয়াল ভেঙে, ভালোবাসা এবং মানবিকতাকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো বিভাজনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং ঐক্যকে সামনে রেখে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই বাংলাদেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ, যেখানে হিংসা, বিদ্বেষ এবং বিভাজনের কোনো স্থান থাকবে না। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে আজ থেকেই শুরু করতে হবে। আমাদের কথা, কাজ এবং আচরণে ঐক্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সত্যিকার স্বাধীন, সাম্যপূর্ণ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন গর্ব করে বলবে- ‘আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশে বাস করি।’

আমাদের বিভাজন আর হানাহানি দূর করতে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালোবাসা গড়ে তোলা অপরিহার্য। জাতি হিসেবে আমাদের শক্তি ঐক্যে, বিভক্তিতে নয়। ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক মতভেদ থাকলেও আমরা যদি মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় এসে দাঁড়াই, তবে বিভাজন ভুলে আমরা সবাই একে অপরের আপনজন হয়ে উঠতে পারি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে যে ঐক্যই বিজয় এনে দেয়। আসুন, বিভেদ ভুলে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ি।

লেখক : ব্লগার, সাংবাদিক

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়