প্রবীর বিকাশ সরকার

  ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

পুতুলের বাক্স

শহরের মুহুরি পাড়ার ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের দিনগুলো অবারিত আনন্দেই কাটছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালের শেষদিকে দ্রুতই ছন্দপতন হতে শুরু করল বড়দের মতো ছোটদের মধ্যেও। বাড়িতে, উঠোনে, পুকুর পাড়ে, স্কুলে জটলা বড়দের। ফিসফাস করে কথাবলা। স্কুল অনিয়মিত হয়ে পড়া। কলেজের ছাত্রনেতারা এসে বক্তৃতা দেয় স্কুলের মাঠে। উচ্চকণ্ঠে স্লেøাগান দেয়। সন্ধেবেলায় মশাল হাতে দীর্ঘ মিছিল যায় রাস্তা দিয়ে।

বুড়া খাল নামে একটি বড় ড্রেন মুহুরিপাড়া ও বিহারী কলোনিকে আলাদা করে রেখেছে। সেই খালের সেতু পেরিয়ে বিহারী কলোনির প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে ছোটরা ভিড় করে দেখে বড় রাস্তার মিছিল। কেমন যেন অদ্ভুত এক শিহরণের দ্যুতি তাদের চোখেমুখে! পটলের ইচ্ছে করে মিছিলের শরিক হতে। বারো বছরের কিশোর পটলের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ফেরার পথ জানা নেই তাই সাহস হয় না। ছোটরাও স্লেøাগানে তাল মেলায় বুঝে না বুঝেই। ফেস্টুন, পোস্টারে লেখা নানা স্লেøাগান পড়ে। কোনো কোনোটায় লালরঙা ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি দেখে নড়ে চড়ে ওঠে। এই স্বাধীনতার কথাই বড়রা এখন বলাবলি করছে যা তাদের কানে আসছে।

পাড়ায় সারাদিনই ফিসফাস, তর্কাতর্কি। বড়রা রেডিও খুলে সারাদিনই খবর শুনে, পত্রিকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। চোখেমুখে তাদের অস্থিরতা, চাঞ্চল্য। কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ দেখে পটলও কিছুটা বুঝতে পারছে যে, কিছু একটা হচ্ছে দেশের মধ্যে। তাই সবাই চিন্তা করছে। বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে, আন্দোলন করছে।

কিন্তু নতুন বছর অর্থাৎ ১৯৭১ সাল এলে পরে পরিস্থিতি আরো জোরালো এবং গরম হয়ে উঠল। সারাদিন মিছিল, জটলা, ফিসফাস, পাড়ার দোকানে দোকানে, বাসাবাড়িতে, উঠোনে। স্কুলগুলো এক এক করে বন্ধ হয়ে গেল। বলাবলি হচ্ছে দেশে নাকি যুদ্ধ বাধবে! রাস্তায় পুলিশ আর সৈন্য টহল দিচ্ছে জিপ, ট্রাকের ওপর বন্দুক ধরে। পুকুরের পশ্চিম পাড়ের জেলখানা রোড ধরে সকাল-বিকাল-রাতে একাধিক মিলিটারিভর্তি গাড়ি দেখে ছেলেমেয়েরা ভীষণ কৌতূহলী হয়ে পড়ছে। এর আগে কখনো এমনটি তারা দেখেনি।

এর মধ্যে পুলিশ এসে মুহুরি পাড়ার কয়েকজন নেতা ও কলেজ ছাত্রকে ধরে নিয়ে গেলে সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল। ছেলেরা মাঠে না গিয়ে পাড়ার বাসাবাড়ির আনাচেকানাচে খেলে। মেয়েরা পুকুরসংলগ্ন কাঁঠালতলে পুতুলখেলা, রান্নাবান্না খেলা, লুডুখেলা আর ঘরে সেলাই নিয়ে ব্যস্ত।

দেখতে দেখতে মার্চ মাস এসে গেল। পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেল। পাড়ায় অস্থিরতা ভীষণ। কারো মনেই শান্তি নেই। কেবল দুশ্চিন্তা। কেবল অজানা ভয়। পটল, কিশোর, দীপু, জাকির, বাদল, ফজলু এরা অদ্ভুত এক ব্যাপার লক্ষ করল, কয়েক দিনের মধ্যেই অধিকাংশ হিন্দু পরিবার গ্রামে চলে যেতে লাগল। মালামাল পড়ে রইল। শুধু কাপড় আর টাকাপয়সা নিয়ে নদীর ওপারে চলে যাচ্ছে।

মার্চ মাসের মাঝামাঝি অনেক মুসলিম পরিবারের মহিলারাও ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রাম চলে গেলেন। পাড়াটি প্রায় লোকশূন্য হয়ে গেল। এমনকি, কিশোর এবং দীপুরাও রাতের অন্ধকারে কোথায় চলে গেল পটল জানতেই পারল না! একমাত্র হিন্দু পরিবার হিসেবে এত বড় পাড়াটিতে পটলরা আর ছ-সাতটি মুসলিম পরিবার ছাড়া আর সব পরিবারই নাই হয়ে গেল! বুড়া খালের ওপারে বিহারী কলোনি অবশ্য জমজমাট। সেখানে বিহারীরা দিন দিন চাঙ্গা হয়ে উঠছে, এতদিন মনমরা ছিল। সবগুলো পরিবারই ইন্ডিয়ার বিহার থেকে আগত ১৯৪৭ সালে। সবাই খুবই দরিদ্র। রিকশা চালায়, পানবিড়ি ও চানাচুর বিক্রি করে; লেপ, তোষক, বালিশ তৈরি করে, কলকারখানায় কাজ করে সংসার চালায়। পটল এসব দেখে আসছে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে। এই বিহারী কলোনির মধ্যে একটি পাঠান পরিবার বেশ সচ্ছল। প্রবীণ পাঠান সর্দার খাঁ সাহেব বিহারীদের আসার অনেক আগেই এখানে বসবাস করছেন। তার দুছেলে অফিসে চাকরি করে। খাঁ সাহেব দামি পাথরের ব্যবসা করেন। খুব ভালো মানুষ বলে মুহুরি পাড়া ও বিহারীরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও মান্য করে। সেই বিহারী কলোনিতে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বলে পটলের মনে হতে লাগল। কিন্তু কী সেটা জানে না। বড়দের জিজ্ঞেস করেও সদুত্তর পায়নি।

পটলরা তিন ভাইবোন। সে বড়, তারপর ভাই ও বোন। ছোটবোনটির নাম সীমা, বয়স মাত্র চার। ওর সবচেয়ে প্রিয় সমবয়সী বান্ধবী চিনু। ওদের পাশের লাগোয়া বাসাটিই চিনুদের। চিনুর বাবা মনোরঞ্জন দত্তের চা-পাতার দোকান আছে। দুসপ্তাহ আগেও দ্-ুবান্ধবী মিলে মাটি, কাঠ আর কাপড়ের পুতুল দিয়ে একসঙ্গে খেলছিল। ধুলোবালি, পাতালতা দিয়ে রান্নাবান্না খেলা করছিল কাঁঠাল গাছের তলে। হাসাহাসি, কোলাহল করে একে অপরের গায়ে লুটিয়ে পড়ছিল। এখন পটল দেখছে সীমা দুপুরের পরে একাই খেলছে পুতুল দিয়ে। মুখটার তার ভারভার।

চিনুরা চলে গেল গ্রামের বাড়িতে একদিন সপরিবারে কাঁদতে কাঁদতে। এবারই প্রথম বিচ্ছেদ। গরুর গাড়িতে করে মালামাল নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিল বড় শিমুল গাছের নিচ দিয়ে। অশ্রুসজল চোখে সীমা বিদায় দিল চিনুকে। যাওয়ার সময় তার পুতুলের বাক্সটি সীমার হাতে দিয়ে বলল, “আমরা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি রে। বাবা বলল, শিগগিরই আবার ফিরে আসব আমরা। পুতুলগুলো দেখে রাখিস। ফিরে এসে আবার খেলব।”এর পর থেকে সীমা কাঁঠাল তলে একাই দুজনের পুতুলগুলো দিয়ে খেলছে। পটল মাঝে মাঝে সঙ্গ দেয়। খুব খারাপ লাগছিল সীমাকে দেখে তার। মুখটা থমথম করছে।

কিন্তু সেই খেলাও থেমে গেল। ২৫ মার্চ রাতে পুলিশ লাইন আক্রমণ করল মিলিটারিরা। পটলরা বারান্দা থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ, মানুষের চিৎকার শুনতে পেল! আর দেখল আগুনের লাল-হলুদ কুণ্ডুলি... পাকিয়ে পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠছে! বাতাসে বারুদের খুসখুসে বিশ্রী গন্ধ। পুলিশ লাইন খুব কাছে বলেই গোলাগুলির বিকট শব্দ আর মানুষের হৈচৈ চিৎকার অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ভয়ে ভয়ে পটল তার বাবা ও মা রাতটি নির্ঘুম কাটাল।

পরের দিন সকালবেলা পুরো শহর যেন মৃত। কোনো সাড়াশব্দ নেই। লোকজন নেই রাস্তায়। শুধু কিছু কাক কা কা ডেকে উড়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। দুপুরের দিকে পাড়ায় মিলিটারি এলো। কালো পোশাকপরা অল্পবয়স্ক কয়েকজন সৈন্য। তারা কারো কোনো ক্ষতি করেনি। কিছুই বলেনি। তল্লাশি করে চলে গেল। বিহারী কলোনির নেতা এক পাঠান প্রবীণ সর্দার পটলের বাবার খুব ভক্ত। তিনি সকালেই এসে পটলের বাবাকে অভয় দিলেন। বললেন, “সুরেশবাবু, ঘাবড়াও মাত! ভয় পেও না। তুমি থাকো। কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। আমি আছি। অনেক ঘটনা ঘটবে। ভয় দেখাবে বিহারীরা। শুধু আমার নাম বলবে। তোমার শ্বশুরমশাই পুলিশ কোর্টের দারোগা হলধরবাবু আমার খুব প্রিয় বন্ধু ছিল। তার লেড়কি, এই শীলা বেটি তোমার বিবি হয়। শীলা আমার মেয়ের মতো। তোমাদের কোনো ভয় নেই।”

পটলদেরও আর পালিয়ে যাওয়ার পথ নেই। তার বাবা ভাবতেই পারেননি, পাকিস্তানি সৈন্য নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। মানুষ মারবে অকাতরে।

পাঠান সর্দার খাঁ সাহেবের কৃপায় পটলরা এই বাড়িতেই পুরো নয় মাস কাটাল। শুধু দুবার মিলিটারি আসবে খবর পেয়ে অন্যত্র পালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি থেকে সুরেশবাবু খ্রিস্টান পরিচয়ে পুলিশ অফিসে তার চাকরি করতে লাগলেন। প্রথম দিকে দাড়ি রেখেছিলেন, মাথায় টুপিও পরতেন। পরে অবশ্য ভয়ভীতি অত ছিল না। তবে যে-কোনো সময় পাকিস্তানি মিলিটারির দালালরা ক্ষতি করতে পারত। কিন্তু সর্দার খাঁ সাহেবের ভয়ে কেউ সাহস করেনি।

ছোটভাইবোনরা কিছুই বুঝত না পরিস্থিতির। তারা ঘরে, বারান্দায় এবং মাঝে মাঝে পুকুর পাড়ে খেলাধুলা করত পাড়ার কয়েকটি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। আগস্ট মাসের দিকে অনেক মুসলিম পরিবার ফিরে এলো। মাও কিছুটা সাহস পেল ঘর থেকে বের হতে। তবে শাখা বা সিঁদুর কিছুই পরত না।

সীমাকে দেখছে প্রতিদিনই কাঁঠাল তলে একাই খেলছে নিজের ও চিনুর পুতুলগুলো দিয়ে। তার বয়সী আর কোনো মেয়ে ছিল না আশপাশের পরিবারগুলোতে। একমাত্র চিনুই ছিল।

পাড়ার ছেলেমেয়ে প্রায় সবাই ফিরে আসায় আগের মতোই প্রাণবন্ত হয়ে উঠল পরিবেশ। স্কুল বন্ধ। প্রচুর সময় হাতে। খেলাধুলায় মত্ত হয়ে গেল সবাই। এভাবে ডিসেম্বর মাস এসে গেল। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জিততে লাগল। পরাজিত হতে লাগল পাকিস্তানি সেনা, প্যারা মিলিটারি। খুব মার খাচ্ছে পাকিস্তানি সেনারা সারা দেশে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পথে। বাবার মুখে এসব সংবাদ শুনে মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল পটলের। দেহ মনে আনন্দের শিহরণ! পটল বুঝতে পারল, স্বাধীন হওয়া মানে বাঙালি জাতি নতুন সরকার গঠন করবে। উর্দুভাষী পাকিস্তানিরা এদেশে থাকবে না। স্কুল আবার খুলবে। সব বন্ধুরা আবার আনন্দফূর্তিতে মেতে উঠবে!

এভাবে ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা স্বাধীন হয়ে গেল। চারদিকে মানুষের ছোটাছুটি। ঘর ছেড়ে রাস্তায় জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছে অনেক মানুষ! ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধারা পাড়ায় এসে বন্দুক থেকে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ছে। বিহারী কলোনীর অনেককে ধরে নিয়ে গেছে যারা পাকসেনাকে সহযোগিতা করেছিল। কলোনীতে কান্নাকাটি চলছে। পাঠান সর্দার খাঁ সাহেব অবস্থা বেগতিক বুঝে পরিবারসহ পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেছেন।

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হল। এক এক করে গ্রাম থেকে, ভারত থেকে সবাই চলে আসতে শুরু করেছে। পাড়াটি আবার কলহাস্যে ভরে উঠতে লাগল। কিন্তু এক মাস, দু মাস, তিন মাস চলে যাওয়ার পরও দত্তবাবু পরিবার নিয়ে ফিরে এলেন না। কেউ জানে না কী কারণ?

চার মাস পর পটলের বাবা বাসায় এসে পটলের মাকে নিচু স্বরে জানালেন, দত্তবাবু আগরতলায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রথম দিকে শিবিরে ব্যাপক কলেরা দেখা দিলে পরে যথাসময় চিকিৎসা না পেয়ে পুরো পরিবার গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা গিয়েছে। পটলও এই খারাপ সংবাদ শুনল। মনটা তার ভীষণ কষ্টে ভরে গেল! কিন্তু সীমাকে জানানো হল না কিছুই।

এদিকে সীমা প্রতিদিন চিনুকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য শিমুল গাছের নিচে পুতুলের বাক্সটি হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। পাড়ার সব মানুষ ফিরে এসেছে। ফিরে এলো না শুধু চিনুরা। মা বার বার ডাকলেও সীমা শুনে না মায়ের কথা। রাতে ঘুমের মধ্যে কয়েকদিন ‘চিনু’ ‘চিনু’ বলে ডেকে ওঠেছে। স্বপ্নে চিনুকে দেখতে পেয়েছিল হয়ত।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়