আবু আফজাল সালেহ

  ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

সুশাসন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের চেতনা

প্রকৃত নাগরিকরা চান প্রতি নাগরিক সুনাগরিক হোক, প্রতি নাগরিক বিজয়ের প্রকৃত সুফল পাক কিংবা স্বাধীনতা উপভোগ করুক। বিজয় দিবসের চাওয়া হলো একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক, এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণ। যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উঁচুতে থাকবে, সকল নাগরিকের অধিকার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে ইত্যাদি। এ চাওয়া পূরণের জন্য প্রয়োজন সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সুশাসন নিশ্চিত করবে বৈষম্য মুক্ত হয়ে দেশে ন্যায়নীতি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা। বলা যায়, বিজয়ের এসব চাওয়াই সুশাসনের অন্তর্গত। চব্বিশের অভ্যুত্থানও কিন্তু বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি বিরাট বিজয়।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল বিজয়ের মূল চেতনার। ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। নয়মাসের সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা বিজয় অর্জন করে পতাকা একটি ভূখন্ড পাই-সার্বভৌমত্ব পাই। বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার চেতনাকে কার্যকর ও সুষম শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। আইন তার নিজস্বগতিতে চলতে পারলেই সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আইন তার নিজের গতিতে বা নিজের কক্ষপথে সঠিকভাবে চলতে পারলেই বলা যায় সুশাসন নিশ্চিত। অবশ্য জবাবদিহিতাও প্রধান অংশ। স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণের অধিকার কিংবা সুশাসনের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য উপাদানগুলো আইনের শাসনের উপর নির্ভর করে থাকে। সুশাসন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন। বিজয় আমাদের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দিয়েছে। ফলে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হলে সুশাসনের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। বিজয় সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। গণতন্ত্রহীনতা ও সুশাসনের অভাবে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। তাই সুশাসনই বৈষম্য দূরীকরণের একটি কার্যকর উপায়। সুশাসন নিশ্চিত করে যে, সরকার ও প্রশাসন জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে-যা বিজয় অর্জনের অন্যতম মূল প্রত্যাশা। বিজয় অর্জনের পর সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। উন্নয়ন ও সুশাসন একে অপরের পরিপূরক, তাই একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অর্জন করা সম্ভব নয়। উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসনও সমানভাবে প্রয়োজন। সুশাসন ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসনের অভাব বৈষম্যের একটি প্রধান কারণ, যা বিজয়ের চেতনার পরিপন্থী। সুতরাং বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয় তার সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণ/বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ফলে আমরা পেয়েছি একটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধস¤পন্ন দেশ। সুশাসন যেমন গণতন্ত্রের প্রাণ, তেমনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও সুশাসনের প্রাণ। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে পরমতসহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য অর্জিত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য শাসনব্যবস্থা ও বিচার বিভাগকে আলাদা করতে হবে। যার যার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। লালফিতায় বন্দিথাকা থেকে মুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকার অতি সম্প্রতি বিচার বিভাগের আলাদা করে স্বাধীন করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের মহতী এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে প্রশংসিত হবে।

সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন, যা ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। এটি নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করে এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে। আইনের শাসন ছাড়াও, সুশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সাম্য। Governance: The world Bank's Experience Reportৎঃ অনুযায়ী সুশাসনের উপাদান চারটি-যথা: ১. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ২. জবাবদিহিতা, ৩. আইনি কাঠামো, ও ৪. স্বচ্ছতা। আইনের শাসন সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর অর্থ হলো আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সকল নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও পুরুষ, রাজনৈতিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। সমাজের সকল স্তরের মানুষ যেন সমান অধিকার ও সুযোগ লাভ করে, তা নিশ্চিত করা হয়। গণতন্ত্র সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গণতন্ত্রের পাশাপাশি জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ আইনি কাঠামো প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক (১৯৯৬ ২০০৮) দশকে ৬টি মাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে: ১. বাক-স্বাধীনতা, ২. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতার অনুপস্থিতি, ৩. সরকারের কার্যকারিতা ৪. নিয়ন্ত্রণ ৫. আইনের শাসন ও ৬. দুর্নীতি। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চাকরিতে বৈষম্য সৃষ্টি করাও ছিল মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি সক্রিয় ও শক্তিশালী উপাদান। ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকরাসহ উল্লিখিত বিষয় অধিকতর জোর দিতে হবে। এসব বিষয়ে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নিতে পারলেই সুশাসন নিশ্চিত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

নিজস্ব সংস্কৃতি আয়ত্ত্ব, চর্চা কিংবা অনুশীলন করার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করাই বিজয়ের অন্যতম অভিলাষ-চেতনার অংশ। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, বাউল কিংবা নিজস্ব সংস্কৃতি বা উৎসব পালনের অঙ্গীকার ছিল বিজয়ের ভাবনার অংশ। কিন্তু, এ বিষয়ে সংকট চলমান। সময়ে সময়ে এ বিষয়টি খুবই ক্রিটিক্যাল হয়ে যায় কিংবা যার যার সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়-পরে আবার বিরোধিতাও করা হয়। দ্বৈত এ-নীতি বাংলাদেশে চলমান। এ থেকে মুক্তি পেতেই হবে, পরজাতির সংস্কৃতির মধ্যে হারিয়ে দেওয়া যাবে না। স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নির্মাণ করা-যেখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সব ধর্মের মানুষেরা নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা লাভ করতে পারবেন। ফলশ্রুতিতে, সাম্য-সম্প্রীতির বন্ধনে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে আমাদের বিজয় দিবস। কিন্তু, বিজয়ের প্রকৃত স্বাদ আমরা এখনো পাইনি। বিজয়ের চেতনা বা উদ্দেশ্যগুলো আমরা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়কে একটি পতাকা কিংবা একটি ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে চেয়েছি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারীদের গভীরভাবে স্মরণ রেখে এবং বিজয় দিবসকে প্রতীকী হিসাবে বিবেচনা না-করে তার অন্তর্নিহিত চেতনাকে ধারণ ও উপলব্ধি করে এগিয়ে যেতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে দেশের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে ‘সোনার বাংলা’ গড়া সম্ভব হবে এবং বিজয়ের উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর হবে বলে মনে করি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়