ড. মাহবুব হাসান

  ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৪

আওয়াজ উডা বাংলাদেশ

আমাদের চেনা মানুষগুলোর মুখ অচেনা হয়ে যাচ্ছে। কথাটা ‘যাচ্ছে’ না বলে, বলা উচিত অচেনা হয়ে গেছে। এটা দেশের মধ্যে যারা বিগত সরকারের সঙ্গে মানসিকভাবে ও মননগতভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের মুখও অচেনা লাগছে। ভারতের মিথ্যাচারের পর তাদের নিজেদের অস্তিত্ব যে বিপন্ন হয়ে পড়ছে, সেটা ভাবছে না। কেন ভাবছে না। তারা কি ভাবছে ভারতের এ সাইবার মিথ্যার বদৌলতে শেখ হাসিনা আবারো ফিরে আসবেন, এই খুশিতে আছেন? নাকি তারা জানেন না বা উপলব্ধিই করতে পারছেন না যে ভারতের এই যুদ্ধংদেহী আচরণ অন্য কোনো উদ্দেশে রচিত?

আবার অনেকের চেহারায় এটাই ফুটে উঠেছে যে, সত্য বললেই মানে হাসিনার স্বৈরাচারিতা, লুটপাট এবং মানুষ হত্যার রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা বললেই তারা নাখোশ হচ্ছেন। কারণ ওই লুটপাট, ওই হত্যাযজ্ঞ হাসিনার পুলিশ করেছে এটা বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে ওই হত্যাযজ্ঞ জঙ্গিরা করেছে। আর জঙ্গি হচ্ছে জামায়াত-শিবির এবং বিএনপির লোকেরা, যারা দেশের বিরুদ্ধে ১৫ বছরের দুঃশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে বিজয় অর্জন করেছে। ১৩ জন পুলিশ হত্যার শিকার হয়েছে বলে শেখ হাসিনা বলেছেন, তার পুলিশ হত্যাকারীরাই সব হত্যার জন্য দায়ী। তার পুলিশ গুলি করে মানুষ মারেনি।

এই যে বিশ্বাস আর অবিশ্বাস, তা রাজনৈতিক অংশ। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ মানেই মিথ্যাচার ও অবিশ্বাস রচনার উপাদানে ভরপুর। মিথ্যা যে টিকতে পারে না, শেখ হাসিনা তার বড় প্রমাণ, বড় ইতিহাস। তার পলায়নও যে রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় আকর অংশ, সেটাও তারা মানতে রাজি না। এরকম ক্রসকারেন্টে ভরপুর আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ভারতপন্থি, কোনো কোনো দল ইসলামপন্থি হওয়ায় গণতান্ত্রিক রীতির পক্ষে নয়। কোনো দল দেশপ্রেমের কথা বললেও তাদের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ করে। ফলে জাতীয়ভাবে তারা অনৈক্যের মধ্যে রাজনৈতিক খেলোয়াড় হয়ে খেলছেন। কিন্তু একবারো ভাবছেন না যে তারা পরস্পরের ভাই এবং তাদের মধ্যে জাতীয় প্রশ্নে ঐক্য জরুরি। নিজের বা তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে ঐক্যের বিকল্প নেই।

চিকেন নেকের ভয় দেখিয়ে ভারতকে ঠেকানো যাবে না। কেননা তারা সম্প্রসারণবাদী। আমাদের দেশটা তাদের দরকার। না হলে ৭টি রাজ্যকে কঠোরহাতে দমন করে রাখতে পারছে না। আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম নৌবন্দর তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। ছলে-বলে-কলা-কৌশলে চাণক্য নীতিই তাদের এখন প্রধান অবলম্বন। সাইবার আক্রমণে আমরা তা দেখেছি।

ঐক্য কেন জরুরি?

কারণ দেশ এখন আক্রান্ত। দুভাবে দেশ ভারতের আক্রমণের শিকার। আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনারের অফিস আক্রান্ত হয়েছে কিছু উগ্র ভারতীয়ের হাতে। তারা ভাঙচুর তো করেছেই, পুড়িয়েছে আমাদের জাতীয় পতাকাও। আমরা তো জানি, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো দেশের হাইকমিশন বা দূতাবাস সেই দেশেরই অংশ বলে বিবেচিত হয়। সেই অর্থে আগরতলার হাইকমিশন অফিস মানেই বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশে আক্রমণ করার কী অর্থ, তা আমরা জানি-বুঝি। আর যারা আক্রমণ করেছে তারাও জানে তারা কী অন্যায় করেছে। আগরতলা পুলিশ অবশ্য কয়েকজনকে আটক করেছে। কিন্তু দিল্লি ওই অপরাধের বিষয়ে কোনো ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ নেয়নি। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার পররাষ্ট্র দপ্তরে এসে বলেছেন বটে, এর ফলে দুদেশের সম্পর্কের মধ্যে কোনোরকম ঘাটতি হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হাইকমিশন আক্রমণ ও পতাকা পোড়ানোর পর ওই কথাতো গরু মেরে জুতা দানের শামিল। এই ঘটনার পর আমরা কি উগ্র আচরণ করব? নাকি তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে পাল্টা জবাব দেব? সিদ্ধান্ত আপনার। ভারত বারে বারেই প্রমাণ করেছে তারা প্রতিবেশী দেশের জন্য বিশ্বস্ত নয়। তাদের পররাষ্ট্রবিষয়ক নীতি সুদূর অতীতের চাণক্যের চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে। দেশটার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বড় ভাইসুলভ, কিন্তু প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোকে ছোট ভাইয়ের স্বাধীনতা ও মর্যাদার চোখে দেখে না। বরং কীভাবে সেই দেশগুলোর সহায়-সম্পদ লুটে নেবে, সেই ষড়যন্ত্র মনে-মননে চলতে থাকে। তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও সেটা প্রকাশ পায়। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে হাসিনার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের তীব্রতা দেখে দিল্লির আওয়াজ উঠল, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। অর্থাৎ হাসিনা সরকারের অবস্থা বেগতিক হলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে। নামটা এখন মনে পড়ছে না, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সেই আচরণ ও কথা শুনে মনে হলো বাংলাদেশ তাদের করদ রাষ্ট্র। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের জন্য কেবল হাসিনাই দায়ী নয়, ভারতও যে কিছুটা দায়ী সেটা মনে রেখেছে দেশবাসী। আমাদের জনগণ সেটা দেখে আসছে এবং শিখেছে ৫৩ বছরে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচরণের সঙ্গে সামরিক হুমকিও অনুভব করেছে। সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে বেরুবাড়ি নিয়ে যাওয়া, তিন বিঘা পরিমাণ ভূমির করিডর না দিয়ে নাকে রশি দিয়ে ঘোরানো, মিথ্যাচার করে সীমান্তে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশিদের নিয়মিতই হত্যা করা তাদের স্বভাবের অন্তর্গত। বন্ধুরাষ্ট্র বলে আমরা দাবি করলেও তারা যে আমাদের বন্ধু নয়, প্রতিটি পদক্ষেপই তা টের পায় দেশের জনগণ। ১৯৭১-এ ভারত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১ কোটি লোককে আশ্রয় দিয়ে আমাদের চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞতার বড়শিতে গেঁথে রেখে আমাদের সঙ্গে অনৈতিক ও অপরাধমূলক বৈরী আচরণ উপহার দিয়ে আসছে। এই অসম সম্পর্ক যে টিকতে পারে না, সেটা বোঝার মতো মানসিক শক্তি ও সাহস দিল্লির নেই। তার শক্তি সামরিক খাতে প্রবাহমান, তার শক্তি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে, যা ব্রিটিশ শিক্ষা সচিব মেকলে সেই আমলে তার সহকর্মীদের নির্দেশনামূলক বক্তৃতায় শিখিয়েছিলেন। ভারতীয় ক্ষমতাবানরাও মনে করে বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে কুপোকাত করতে পারবে। কিন্তু এটা তারা বোঝেনি যে শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ সামাজিকভাবে স্বাধীন বৈশিষ্ট্যের অধীন, তারা কারো বশ্যতা মানতে রাজি নয়। এই স্বভাব অনেকটাই পাঠান আফগানিদের মতো। ব্রিটিশরা তাদের পদানত করতে পারেনি। আমেরিকানরা ২০ বছর দেশটি দখল করে রেখেও তাদের করায়ত্ত করতে পারেনি। অবশেষে চলে গেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারকে উৎখাতে এই বাংলার মানুষই আন্দোলন শুরু করেছিল। ভারতের স্বাধীনতার জন্য বাংলাই প্রথম আওয়াজ তুলেছিল। কাজী নজরুলই প্রথম পরাধীন ভারতের প্রধান বিপ্লবী, যিনি তার অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতুতে লিখেছিলেন, ভারত চায় পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা। আরো বহু ইতিহাস এই পূর্ব বাংলাদেশের রয়েছে, যা বিস্মৃত হয়েছে ভারত। আমরা শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশি, গোলমাল আমাদের পছন্দ নয়, আমরা নীরবেই জীবনকে উপভোগ করতে চাই। কিন্তু আমাদের ওপর চড়াও হলে আমরা তা প্রতিরোধ করি। সেটা টের পেয়েছে আজকের পাকিস্তানের সামরিক জেনারেলরা। সেসব তথ্য-উপাত্ত কিন্তু আছে ভারতের ভাণ্ডারেও। অতএব হে প্রতিবেশী রাঘববোয়াল- নীতি পাল্টাতে হবে, কৌশল পাল্টাতে হবে, চাণক্যের গ্রাম্য নোংরামি দিয়ে প্রতিবেশীকে শায়েস্তা করার পথ পরিত্যাগ করে সহাবস্থান, সহমর্মী ও বন্ধুত্বকে মর্যাদায় উত্তরণ করতে হবে। এর অন্য কোনো বিকল্প নেই।

আবার আওয়াজ উডা বাংলাদেশ-হঠাৎ করেই বেজে উঠল শব্দ তিনটি। গণমানুষের ভাষায়। গণঅভ্যুত্থানের সময় এই স্লোগানটি শুনেছিলাম। আমার মনের ভেতর তা গেঁথেছিল। সেই গেঁথে থাকা আওয়াজ বুকচিরে বেরিয়ে আসছে। কী করবেন, সিদ্ধান্ত আপনার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়