সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

  ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৪

জয়ী হবই, যদি যুদ্ধে থাকি

বিদ্যমান ব্যবস্থাটাকে বদলাতে হবে, নইলে আমাদের মুক্তি নেই। বুঝতে হবে যে ব্যবস্থাটা পুঁজিবাদী। অপরাধ ব্যক্তিই করছে, তাকেই দেখা যাচ্ছে সামনে, কিন্তু মূল অপরাধী হচ্ছে ব্যবস্থাটা। সেই আসল অপরাধকারী। সে লুকিয়ে থাকে। এই অপরাধীকে চিহ্নিত করা দরকার এবং তাকে বিদায় করা চাই। সংশোধনে কুলাবে না, সংস্কার তো সংরক্ষণেরই পদক্ষেপ। উদারনীতিকরা সংস্কার, সংশোধন ইত্যাদি চিকিৎসার কথা ভাবেন, ব্যবস্থাপত্র দেন, কিন্তু তাতে অপরাধীর স্বভাব-চরিত্রে ও অপরাধলিপ্সায় যেকোনো পরিবর্তন আসছে তা মোটেই না। ৫ আগস্ট-পরবর্তী এখন তো দেখা যাচ্ছে ব্যবস্থাটা আরো বেশি মরিয়া ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, মরণকামড় বসাচ্ছে, পৃথিবীর সর্বত্র নিকৃষ্টমানের মানুষরা সর্বাধিক ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, তারা সবকিছু তছনছ করে দেওয়ার ব্রত নিয়েছে। পৃথিবী নামের এই গ্রহটিতে মানুষ আর টিকে থাকতে পারবে কিনা সেই প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।

এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যত্র যেমন তেমনি বাংলাদেশে দেখছি আমরা পুঁজিবাদীরা নিজেদের ‘আলোকিত স্বার্থ’ যে রক্ষা করবে তার ব্যবস্থাটাও অক্ষুণ্ণ রাখতে পারছে না। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় যে সংসদীয় নির্বাচনব্যবস্থা সেটাও ভেঙে পড়েছে। অর্থাৎ ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এক পায়ের ওপর ভরসা করে দাঁড়ানোর জন্য সে ব্যর্থ কসরৎ করছে। তা নির্বাচনব্যবস্থা না থাকলে কি ঘটতে পারে? হয়ত নৈরাজ্য আসবে। হয়ত ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে। তেমন ঘটনা নিশ্চয়ই মঙ্গলজনক হবে না।

পুঁজিবাদ ব্যক্তিস্বার্থকে প্রধান করে তোলে, স্বার্থবোধের গোপন জায়গাটাতে নীরবে ঘা দিয়ে ব্যক্তির ভেতরের মুনাফালিপ্সাটাকে জাগিয়ে তোলে। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ‘সাহিত্যে চাবুক’ নামের একটি প্রবন্ধে বলেছেন যে, বাংলা ভাষায় ‘মি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দগুলো খুবই নোংরা, ভণ্ডামি, ইতরামি, বাঁদরামি, গুণ্ডামি, নোংরামি, ভাঁড়ামি সবকিছুতেই ওই ‘মি’ হাজির; তবে মানুষের জন্য সবচেয়ে সর্বনাশা হচ্ছে- ‘আমি’, কারণ ওই পদার্থটির আধিক্য ঘটলে বিদ্যাবুদ্ধি কাণ্ডজ্ঞান সবকিছু লোপ পায়। এখন সর্বত্রই কিন্তু ওই আমির তাণ্ডব। মধ্যযুগের কবি যে গেয়েছে গান, ‘আপন আপন করে তুই হারালি তোর যা ছিল আপন’, সেটা এখন অন্য,যেকোনো সময়ের তুলনায় জাজ্বল্যমানরূপে সত্য। আমার ‘আমি’ এখন আমরা হতে চায় না; আর হয় যদি তবে ‘তোমাদের’ সঙ্গে যুদ্ধ বাধায়। বোধ ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ বলবেন আজ প্রয়োজন সর্বজনীন ‘আমরা’ হওয়া। বলবেন, তার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি আবশ্যক। আসলে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতিও যথেষ্ট নয়, দরকার হবে রাজনৈতিক কাজ, সে কাজের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পুঁজিপন্থি ভূমিকার অবসান ঘটল। সমাজ পরিবর্তন ছাড়া সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়।

পরিবর্তনের জন্য অত্যাবশ্যক সাংস্কৃতিক কাজটি বাংলাদেশে আমরা করছি কি? না, করছি না। যেমন ধরা যাক, পাঠাগার। পাঠাগারে গিয়ে তো মানুষ একত্র হতে পারে। বইকে কেন্দ্র করে মেলামেশা সম্ভব। কিন্তু মানুষ তো এখন আর বই পড়ায় আগ্রহী নয়, পড়লেও পাঠাগারে যায় না; ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটে টেপাটেপি করে ঘরে বসে যান্ত্রিক বই সংগ্রহ করে নিয়ে কোণায় বসে বসে পড়ে। পাঠাগার কেবল বই সংগ্রহের জায়গা হলে সেখানে লোক পাওয়া কঠিন হবে; হচ্ছেও। পাঠাগারকে সংস্কৃতি-চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। পাঠাগার হবে সামাজিকভাবে মিলবার একটি জায়গা, যেখানে মানুষ কেবল বই পড়ার জন্য যাবে না, নানান ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আকর্ষণেও যাবে। পাঠাগার হওয়া চাই একটি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে বই নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নাটক, গান, আবৃত্তি, বিভিন্ন দিবস উদযাপন, আলোচনা, বক্তৃতা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা প্রতিযোগিতা, অনেক কিছুর আয়োজন করা সম্ভব। সেটা করা গেলে বিকেল হলেই মানুষ ওই আশ্রয়ের দিকে রওয়ানা হবে। ছাত্র, কর্মচারী, শিক্ষক, অবসরভোগী, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী সবাই আসবে। মিলবে-মিশবে; সামাজিক হবে। আলোচনা করবে ব্যবস্থা-পরিবর্তনের মতাদর্শ নিয়ে। সবকিছুর ভেতরই মতাদর্শিক বিবেচনাটা থাকবে, মিছরির ভেতর যেমন সুতা থাকত, যে সুতা ছাড়া মিছরি তৈরি করার কথা ভাবা যেত না।

দৃষ্টি দিতে হবে শিশু-কিশোরদের ওপর। খুবই জরুরি হচ্ছে একটি কিশোর আন্দোলন গড়ে তোলা। একসময়ে কিশোর আন্দোলন ছিল; এখন নেই, পুঁজির শাসক সবগুলোকেই গ্রাস করে ফেলেছে। মুকুল ফৌজ গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সে সংগঠন তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলতে থাকে, একসময়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। খেলাঘর যুক্ত ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে; কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিখণ্ডিত হওয়া এবং বিভিন্ন স্রোতে বিভক্ত হয়ে পড়াতে খেলাঘর এখন আর নেই বললেই চলে। কচিকাঁচার মেলা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারাতে গড়ে উঠেছিল। ওই ধারাও তার ভেতরকার উৎসাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলেছে। কিশোরদের এখন কোনো সংগঠন নেই। তারা স্কুল ও কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটি করে, ঘরে ফিরে ইন্টারনেট ও ফেসবুকের ওপর নুইয়ে থাকে, বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়; অনেকে মাদকাসক্ত হয়, জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। কিশোরকে নিয়ে আসা চাই বড় অঙ্গনে। তার সৃষ্টিশীলতা ও দুঃসাহসকে উৎসাহিত করা অত্যাবশ্যক। সৃষ্টিশীলতা বাড়ে সামাজিকতায়; আর সবচেয়ে বড় দুঃসাহসিক কাজটা হলো সামাজিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ। দেশব্যাপী একটি কিশোর আন্দোলন গড়ে তোলা আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

যুগ এখন মিডিয়ার। মিডিয়ার এত ক্ষমতা আগে কেউ কখনো দেখেনি। মিডিয়া পুরোপুরি পুঁজিবাদীদের দখলে। পুঁজিবাদের বড় একটা ভরসাও ওই মিডিয়ার ওপরই। বাংলাদেশে সমাজ-পরিবর্তনকামীদের হাতে মিডিয়া নেই। দৈনিক দূরের কথা, একটি সাপ্তাহিকও নেই। খুব দরকার অন্তত একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা চালু করার। সে পত্রিকা দেশ-বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে যা ঘটছে সেগুলো কেন ঘটছে, যা দৃশ্যমান তার পেছনে কোনো স্বার্থের কারসাজি কাজ করছে, ঘটনাবলির তাৎপর্য কী, বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে আপাত-বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর যোগ কোথায়, এবং উত্তরণ কোন পথে সম্ভব- এসব বিষয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে আলোচনা করবে। তাতে পাঠকের জ্ঞান যেমন বাড়বে, তেমনি সৃষ্টি হবে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দীপনা। সমাজকে যারা বদলাতে চান তাদের পক্ষে সবাই মিলে অন্তত একটি সাপ্তাহিক প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া অত্যাবশ্যক। এটি হবে বড় একটি সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ।

স্বাধীনতার পরে মনে হয়েছিল দেশে একটি নাট্যান্দোলন শুরু হবে। শুরু হয়েছিল, কিন্তু এগোয়নি। শিল্পীরা চলে গেছেন টেলিভিশনে ও সিনেমায়। তেমন গান গাওয়া যায়নি, যা মানুষকে একইসঙ্গে আনন্দ দেবে এবং উদ্দীপ্ত করবে। কবিতা লেখা হচ্ছে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা নিয়ে, তাতে দুঃখের দুর্বিষহতা যত পাওয়া যাচ্ছে, গভীর কোনো দার্শনিকতা তত পাওয়া যাচ্ছে না।

মোট কথা, বিদ্যমান অন্ধকারে মননশীলতা ও সৃজনশীলতার আলো জ্বালা চাই, যে আলো সম্ভব করবে সাংস্কৃতিক জাগরণের এবং পথ দেখাবে সামাজিক বিপ্লবের, যার মধ্য দিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা বর্তমান পুঁজিবাদী স্তরে আর আটক থাকবে না, বন্ধন ভেঙে, সমাজতান্ত্রিক স্তরে উন্নীত হবে। জীবনে আসবে প্রাচুর্য, জীবনযাপন হবে আনন্দময়। সে কাজ একা কেউ করতে পারবে না, অল্প কজনে কুলাবে না; তার জন্য পাড়ায়-মহল্লায়, যেমন শহরে তেমনি গ্রামে-গঞ্জে, সব ধরনের বসতিতে সংস্কৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলা চাই। ওইখানে পরিবর্তনকামী মানুষের সাংস্কৃতিক লালনপালন চলবে, যে মানুষ সোৎসাহে রাজনীতিতে যোগ দেবে। রাজনীতি বুর্জোয়াদের ক্ষমতা-পরিবর্তনের ক্রীড়া-কৌতুকে সীমিত থাকবে না, হয়ে দাঁড়াবে বিপ্লবীদের সমাজ পরিবর্তনের পদক্ষেপ।

পৃথিবীব্যাপী আজ পুঁজিবাদবিরোধী চেতনা প্রখর হয়ে উঠেছে; সেই চেতনাকে সামাজিক বিপ্লবের পথে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসর করার ওপরই কিন্তু নির্ভর করছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ।

মধ্যযুগের কবির একটা পরামর্শ ছিল : ‘এবার তোর ভরা আপন তুই বিলিয়ে দেরে যারে তারে।’ ওই পরামর্শে কিন্তু কুলাবে না। কেননা বিপদটা হবে এই যে আমার আপন যদি আপনে ভরপুর হয়ে যায়, যদি ভারি হয়ে ওঠে স্বার্থে ও সম্পদলিপ্সায় তবে সে ‘আপন’ নির্ঘাত ডুববে এবং নিজে ডোবার আগে অন্যদের ভরাডুবি ঘটাতে চাইবে এবং তাতে করে সবারই হবে ডোবার দশা। সেটাই এখন ঘটছে, বিশ্বময়। আমার ‘আপন’ ভাসবে যদি নিজে ভারি না হয়ে অপরের সঙ্গে একত্রে ভাসতে চায় তবেই। মুশকিল যা ঘটার ঘটাবে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা। ঘটাচ্ছেও। মানুষের পক্ষে তাই মানুষ থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে, সামাজিকতা হারিয়ে সে অধম হয়ে পড়ছে বন্যপ্রাণীরও।

ক্ষমতাধররা ও বচনবাগীশরা যা ইচ্ছা বলুন, বলতে থাকুন, আসল কথাটা হলো সমাজ পরিবর্তন। সেটা যেন না ভুলি। এটাও যেন না ভুলি যে পালানোর কোনো উপায় নেই, পালালেও বাঁচা যাবে না এবং বাঁচা মানে কেবল টিকে থাকা নয়, মানুষের মতো বাঁচা।

কিন্তু আমরা বাঁচব, অবশ্যই জয়ী হবো, যদি আমরা যুদ্ধে থাকি। ভরসা এই যে আমরা একা নই। বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন যুদ্ধে আছে। প্রতিটি সমাজেই ব্যক্তিমানুষ যতই সন্ত্রস্ত হোক, ভয় পাক, সমষ্টিবদ্ধ মানুষ লড়ছে এবং লড়তে গিয়েই বুঝে নিচ্ছে যে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। বাঁচার সঙ্গে মরার যে যুদ্ধ তাতে পরাজয়ের কোনো স্থান নেই। ইতিহাস এগোচ্ছে এবং এগোবেই। ইতিহাসে বাঁক আছে, কিন্তু থেমে যাওয়া নেই। ইতিহাসকে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে আমরা বাংলাদেশের মানুষরাও আছি। অতীতে ছিলাম, আছি বর্তমানে এবং থাকব ভবিষ্যতেও। তবে ইতিহাস এমনি এমনি এগোয় না; তার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি চাই, অনুশীলন চাই জ্ঞানের ও সৃজনশীলতার। সবার উপরে চাই সংঘবদ্ধতা।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়