সাইফুল ইসলাম, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)

  ৪ ঘণ্টা আগে

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ : পশ্চিম তেলিগাতী প্রাথমিক বিদ্যালয়

৫ বছর পলিথিন টানিয়ে পাঠদান

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন-উপকূলবর্তী জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৯০ নম্বর পশ্চিম তেলিগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি যেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং জরাজীর্ণ ছাপড়া ঘর। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পলিথিন টাঙিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। চরম দুর্ভোগের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দ্রুত একটি নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক, এলাকাবাসী ও শিক্ষকরা।

সরেজমিনে জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের এ বিদ্যালয়টি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনটি নিলাম প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হলেও আজ পর্যন্ত নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ফলে গত পাঁচ বছর ধরে গোলপাতার ছাপড়া ও পলিথিনে ঢাকা অস্থায়ী ঘরে ৯৭ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে।

বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ছয়টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। ২০২৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রোজিনা আক্তার। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সহকারী শিক্ষকের আরো দুটি পদ শূন্য রয়েছে। মাত্র তিনজন শিক্ষককে দুই শিফটে তিনটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জরাজীর্ণ গোলপাতার ছাউনির ওপর পলিথিন টাঙিয়ে কোনোমতে বৃষ্টির পানি ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে নেই বিদ্যুৎ কিংবা বৈদ্যুতিক পাখা। প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীরা অসহনীয় কষ্টে ক্লাস করছে। বৃষ্টি শুরু হলেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। বই-খাতা ভিজে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ছোট্ট অফিসকক্ষে আশ্রয় নিতে হয়। এমনকি একাধিক পরীক্ষাও ওই অফিসকক্ষেই নিতে হয়েছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মমিনুল ইসলাম, আব্বাস মুন্সী, জেরিন আক্তার ও নাসরিন আক্তারসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আর কতদিন এভাবে ক্লাস করব? কবে আমাদের নতুন স্কুল ভবন হবে?

অভিভাবক তাহমিনা বেগম, আমিনুল ইসলাম ও শারমিন বেগম বলেন, আমরা ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূর থেকে হেঁটে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে আসি। লেখাপড়ার মান ভালো হলেও ভবন না থাকায় সন্তানদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগে থাকি। অনেক অভিভাবক ইতোমধ্যে সন্তানদের অন্য বিদ্যালয় ও মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোজিনা আক্তার বলেন, প্রতিদিনই অভিভাবকদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৩ সালে ক্ষুদ্র মেরামতের বরাদ্দ দিয়ে একটি ছোট টিনশেড অফিসকক্ষ নির্মাণ করা হয়। বৃষ্টির সময় সেই কক্ষেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন ভবনের জন্য একাধিকবার উপজেলা শিক্ষা অফিসে আবেদন করা হয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, আমি একসময় এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলাম। তখন থেকেই ভবনের সংকট রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। দ্রুত একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা না হলে বিদ্যালয়টির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, বিদ্যালয়টির ভবন সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। একাধিকবার নতুন ভবনের প্রস্তাবিত তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামী বরাদ্দে বিদ্যালয়টি নতুন ভবন পাবে বলে আশা করছি।

স্থানীয়দের দাবি, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর পলিথিনের নিচে পাঠদান করানো শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, বরং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই শিশুদের নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়