দেলোয়ার হোসেন সোহেল, তানোর (রাজশাহী)

  ৭ ঘণ্টা আগে

রাজশাহীর তানোর

আশ্রয়ণের ঘর বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

রাজশাহীর তানোরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫০টি টিনের ঘর ভেঙে সেখানে তৈরি করা ৪৩টি ঘর বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিসহ আত্মীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মাঝে চরম অসন্তোষ, ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির ভান্ডাইল আশ্রয়ণ গুচ্ছগ্রামে।

সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির ভান্ডইল মৌজায় পুকুর পাড়ে প্রায় ৩৮ বিঘা খাস সম্পত্তিতে ২০০৭ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় টিনের বেড়া দিয়ে ৫০টি ঘর তৈরি করে স্থানীয় ভূমিহীনদের মাঝে দলিল করে বরাদ্দ করা হয়।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়ে স্থানীয় ৫০টি ভূমিহীন পরিবারকে সমিতি গঠনের মাধ্যমে সেখানে বসবাস করার পাশাপাশি ওই পুকুরটিও তাদের জীবিকার জন্য দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ২০২২ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিনের ৫০টি ঘরে ভেঙে সেখানে ৪৩টি পাকা ঘর নির্মাণ করে ৩৯টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও ৪টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিনের ঘরে দলিলমুলে দীর্ঘদিন বসবাস করার পরও পাকা ঘর বরাদ্দ না পেয়ে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিনের ঘরে বসবাস করেছেন তাদের বেশিরভাগ ভূমিহীন। এদের বাদ দিয়ে নতুনভাবে তালিকা করে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার বেশিরভাগ পেয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলামের আত্মীয়স্বজন।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের টিনের ঘরে প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করেও পাকা ঘর বরাদ্দ না পাওয়া মৃত শমসের আলীর স্ত্রী সোনাভান (৫৫) নামের এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি আতিকুল ইসলামের নিজের বাড়ি থাকার পরও তার স্ত্রী, পুত্র হৃদয়, ২ ভাই শফিকুল ও জহুরুল ইসলাম এবং শ্যালক ও সমন্দিসহ মামাতো ও খালাতো ভাই মিলে তার প্রায় ২০ জন আত্মীয়ের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাকে ঘর দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, পুরোনো ঘর ভেঙে নতুন ঘর নির্মাণ হওয়ার কারণে তিনি অন্যের জমিতে (কবরস্থান) অস্থায়ীভাবে ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করছেন। তিনি আরো বলেন, অন্যের জমিতে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরেই রোদবৃষ্টিতে দিনযাপন করছি। অন্যরা যখন একই পরিবারে অনেক ঘর পাচ্ছেন, সেখানে তার মতো বৃদ্ধার কথা একবারও কেউ চিন্তা করলেন না।

মৃত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মরিজান বেওয়া বলেন, আমার নামেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের রেজিস্ট্রি দলিল থাকলেও আমাকেও কোনো ঘর দেওয়া হয়নি। অতিকষ্টে আমিও ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছি। তিনি বলেন, আক্তার আলীর পুত্র শাকিল আলী, জামিলুরের পুত্র সারোয়ার, মৃত রহমানের পুত্র সেকেন্দার আলীর নামে পাকা ঘরের তারিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের কোনো ঘর দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, পারুলের বিয়ে হয়েছে উচাডাঙা গ্রামে। তার পরেও তার নামে ঘর আছে, আবার রাকিব ও তার মেয়ে রুনার নামে ঘর রয়েছে। অন্যদিকে আকতার বানুর নামে ঘর থাকলেও সেই ঘরে কেউ থাকে না। আশ্রয়ন প্রকল্পের টিনের ঘরে বসবাস করা মেছের আলী বলেন, আমি পাকা ঘর পাইনি, তাই রাস্তার ধারে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছি। নতুন ঘর বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও আত্মীয়করণ করা হয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান তিনি।

এদিকে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিশাল পুকুরটি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতেই আতিকুল ইসলাম সভাপতি হয়েছেন। ওই পুকুর থেকে বছরে প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। আতিকুল ওই পুকুর নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের নামমাত্র সুবিধা দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ তার নিজের কাছে রেখেছেন। পুকুরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়ায় তাদের অনেককেই বাদ দিয়ে নিজের আত্মীয়স্বজনদের নামে নতুন ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ভুক্তভোগীরা। তারা বলেন এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কিন্তু প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। ফলে কোনো সুরাহা হয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।

এবিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি আছে সত্যি। তবে, সেটা খাস জায়গায়। সরকার যদি কখানো তার বাড়ি ভেঙে দেয় তাহলে কোথায় যাবেন? তাই তিনি ঘর নিয়েছেন। ওই ঘরে থাকার পাশাপাশি নিজ বাড়িতেও থাকেন বলে জানান। তিনি আরো বলেন, আশ্রয়ণের ৩৯টি পরিবার মিলে তারা পুকুর চাষ করছেন। তেমন কোনো লাভ হয় না। ঘর আপনার আত্মীয়স্বজন বেশিরভাগ পেয়েছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের শুরু থেকেই আমি সমিতির সভাপতি। আমি নামের তালিকা দিয়েছি, বরাদ্দ দিয়েছে প্রশাসন। এখানে আমার কি করার আছে জানিয়ে এড়িয়ে যান তিনি।

তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান বলেন, যাদের পূর্বের ঘরসহ ৯৯ বছরের লিজ দেওয়া থাকে তাদের নতুন ঘর পাওয়ার কথা। যাদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের বের করে দেওয়া বেআইনি হবে। যদি গৃহহীন থেকে থাকে তাদের বরাদ্দের জন্য আবেদন করা যেতে পারে। তবে, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়