reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

“বেগম খালেদা জিয়া – বাংলাদেশের ইতিহাসে আপোষহীনতার ৪১ বছরের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়” 

১৯৪৬ সাল। তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ফেনীর ফুলগাজীর ব্যবসায়ী দম্পতি ‘ইস্কান্দার মজুমদার-তৈয়বা মজুমদার’ এর ঘর আলোকিত করে ফুটফুটে যে কন্যা শিশুটির জন্ম হয়, নাম তার রাখা হয় ‘পুতুল’, পুরো নাম খালেদা খানম – দেখতে ছিল পুতুলের মতোই! ১৯৪৭ সালে ছোট্ট পুতুল তার বাবা-মায়ের সাথে দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় চলে আসে এক বছর বয়সে। বয়স যখন পাঁচ, পুতুলকে ভর্তি করা হয় দিনাজপুর মিশন স্কুলে। এরপর, দিনাজপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি) পাশ করে ১৪ বছরের কিশোরী পুতুল। সেই বছরই পুতুলের বিয়ে হয় একজন আর্মি অফিসারের সাথে – নাম তার জিয়াউর রহমান।

জিয়া ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন; অত্যন্ত মেধাবী এক চৌকস অফিসার। ডিএফআই এর কর্মকর্তা হিসেবে জিয়া তখন কর্মরত ছিলেন দিনাজপুরে। জিয়ার সাথে বিবাহের সূত্রে খালেদা খানম নতুন করে পরিচিত হন ‘খালেদা জিয়া’ নামে। স্বামীর কর্মসূত্রে ১৯৬৫ সালে করাচিতে যাবার আগ পর্যন্ত তিনি দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়নরত ছিলেন। বিয়ের ৮ বছর পরে, ১৯৬৮ সালে খালেদা জিয়া মা হন ২২ বছর বয়সে; জন্ম নেয় জিয়া দম্পতির প্রথম সন্তান – তারেক রহমান। পরের বছর, ১৯৬৯ সালে জন্ম হয় তাদের দ্বিতীয় সন্তান, আরাফাত রহমান। ঐ বছরই জিয়া মেজর পদবী নিয়ে বদলি হয়ে করাচি থেকে আসেন চট্টগ্রামে; স্বপরিবারে বসবাস করতে থাকেন ষোলশহর এলাকায়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্বপাকিস্তানে “অপারেশন সার্চ লাইট” শুরু করলে মেজর জিয়া বিদ্রোহ করেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। একজন বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে থাকেন; স্বেচ্ছায় বেচে নেন অন্ধকারের জীবন – জয় করেন মৃত্যু ভয়।

বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার জীবনেও অবধারিতভাবে নেমে আসে অতল-গহীন অন্ধকার। তিন বছর বয়সী তারেক আর দুই বছর বয়সী আরাফাতকে নিয়ে খালেদা জিয়ার পালিয়ে বেড়ানোর দুর্বিষহ ও অনিশ্চিত জীবন শুরু মাত্র ২৫ বছর বয়সেই; দাম্পত্য জীবনের ১১ বছরের মাথায়। কিন্তু বেশি দিন আর পালিয়ে থাকতে পারেন নি; পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন জুলাইয়ের ২ তারিখে।

১৯৭৭ সালে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হলে, ৩১ বছর বয়সে খালেদা জিয়া পান “ফার্স্ট লেডি”র মর্যাদা; একই সাথে পান নতুন পরিচিতি – বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু ভারতীয় পরিকল্পনায় জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে শহীদ হলে মাত্র চার বছরের মাথায় খালেদা জিয়া ফার্স্ট লেডি থেকে হয়ে যান “বিধবা”। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে থেমে যায় ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন। ১৩ বছরের তারেক আর ১২ বছরের আরাফাত, দুই এতিমকে নিয়ে শুরু হয় হার না-মানা জীবন যুদ্ধ।

শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিএনপিতে তিনি যোগ দেন ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে, স্বামী হারানোর প্রায় সাত মাস পরে, শোকাহত জনতার অনুরোধে। ’৮৩ সালে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে পরের বছর বিএনপির চেয়ারপার্সন হন মাত্র ৩৮ বছর বয়সে। দীর্ঘ নয় বছর ধরে ভারতীয় দালাল লেঃ জেঃ এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রলোভন ও চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি; অধিকন্তু, জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে ছিলেন অটল। যার ফলে ১৯৯০ সালে পতন হয় এরশাদের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের। বিনিময়ে বেগম জিয়া ভূষিত হন “দেশনেত্রী” উপাধিতে।

১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হন ৪৫ বছর বয়সে। তার সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত করে। ২ এপ্রিল তিনি নিজে সরকারের পক্ষে সংসদে এই বিল উত্থাপন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন ভূমিকা এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য জনগণ তাকে আখ্যায়িত করে “গণতন্ত্রের মানস কন্যা” বা “গণতন্ত্রের মা” হিসেবে।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এরশাদের সামরিক শাসনের সময় স্বৈরশাসকের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব ও প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে বেগম খালেদা জিয়া সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শাসন আমলে তার উপর বারবার কারাবরণ, আইনি হয়রানি ও গৃহবন্দিত্ব নেমে আসলেও তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। এমনকি, ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া এবং তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে বিদেশে নির্বাসনে যাওয়ার গোপন প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ৬২ বছর বয়সেও তিনি দেশ আর জনগণকে বাদ দিয়ে নিজের ব্যাক্তি স্বার্থে কোনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন নি – এভাবেই তিনি হয়ে উঠেন “আপোষহীন নেত্রী”।

বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়াই একমাত্র উদাহরণ, যিনি ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতে বিজয়ী হয়েছেন। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, খুলনা—যেখানেই নির্বাচন করেছেন, সেখানেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেসব নির্বাচনেও তিনি যতটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তার সব কটিতে জয়ী হয়েছেন। কারণ, তিনি ছিলেন “জননেত্রী”; যার জনপ্রিয়তা ছিল স্থান-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী লোভী হাসিনা মন্ত্রিসভায় বৈঠকের মাধ্যমে মাত্র ১ টাকায় ইজারার নামে “গণভবন” দখল করে নেয়। কিন্তু ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান সেই ইজারা বাতিল ঘোষণা করেন। বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার আমলে ভবনটির নাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রেখে স্থায়ী দখলমুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে, অত্যন্ত প্রতিহিংসা পরায়ণ হাসিনা এর প্রতিশোধ নিতে বেগম জিয়াকে বাস্তুচ্যূত করে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে।

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর, আইনি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ এবং সামরিক-বেসামরিক নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের ৬ নম্বর বাড়ি থেকে, জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয় স্বামী-হারা আর সন্তানদের বিচ্ছেদে কাতর বেগম জিয়াকে। ব্যাপক ভাঙচুর, দুর্ব্যবহার এবং অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে, অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে প্রায় এক কাপড়ে তার ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঘর থেকে অনেকটা টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয় ৬৪ বছরের বৃদ্ধা বেগম খালেদা জিয়াকে। তাও পবিত্র কোরবানীর ঈদের মাত্র চার দিন আগে!

২০১৫ সালে তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিজ বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখে দিল্লির মদদপুস্ট হাসিনা সরকার। তখন তিনি তার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। বড় ছেলে তারেক রহমান ভয়ঙ্কর নির্যাতনের শিকার হয়ে তখন লন্ডনে চিকিৎসাধীন। এই কঠিন সময়ে আসে ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যুর সংবাদ। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে স্বামী হারানোর শোক যে সন্তানদের কারণে সইতে পেরেছিলেন, ৬৯ বয়সে এসে সেই সন্তানদের একজনকে হারানোর শোক তিনি আর সইতে পারেন নি। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন এবং কার্যালয়েই দীর্ঘ সময় কাটান।

দিল্লীর সেবাদাসী, চরম প্রতিহিংসা পরায়ণ শেখ হাসিনা সরকারের আজ্ঞাবহ আদালত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি’ নামে মিথ্যা মামলায় ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় তিন বারের প্রধান মন্ত্রী, ৭২ বছর বয়সের প্রৌড়া বেগম খালেদা জিয়াকে। মাত্র ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাত করার হাস্যকর অভিযোগে। প্রথমে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড কারাগারে বন্দি ছিলেন, পরে স্বাস্থ্যগত কারণে বাংলাদেশ মেদিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি) হাসপাতালে রাখা হয়।

প্রায় দীর্ঘ ২ বছরেরও বেশি সময় কার্যত কারাগারে ছিলেন আপোষহীন নেত্রী। যদিও, ২৫ মার্চ ২০২০ সালে দিল্লির তাঁবেদার সরকার শর্তসাপেক্ষে গুরুতর অসুস্থ বেগম জিয়াকে মুক্তি দেয় (কারাগারের সাজা স্থগিত করে বাসায় চিকিৎসার অনুমতি দেয়); তবে এটিও পুরোপুরি মুক্তি নয় – আইনি শর্তে ওটা ছিল বস্তুতঃ গৃহবন্দিত্বের মতো অবস্থ। অবশেষে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর তিনি পরিপূর্ণ মুক্তি পান, ৭৮ বছর বয়সে।

কিন্তু হাসিনার কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও, হাসিনার নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতার প্রাণঘাতী পরিণতি থেকে মুক্তি পান নি মহীয়সী নারী বেগম খালেদা জিয়া। কারণ তিনি ছিলেন “দেশনেত্রী”, তাই স্বভাবতই ছিলেন ভারত বিদ্বেষী। তার ভারত বিরোধিতা মূলতঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ভারতের আধিপত্যবাদের স্পষ্ট প্রতিবাদ করেছেন এবং সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ও ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি বা ট্রানজিট সুবিধার মতো বিষয়গুলোর সরাসরি বিরোধিতা করেছেন।

স্বামীর দেখানো পথে হেঁটেই বেগম জিয়া হয়েছিলেন ভারতের চক্ষুশ্যূল। একারণেই “র” এর পরিকল্পনায় ক্রমাগত মানুষিক যন্ত্রণা দিয়ে আর চিকিৎসাহীন রেখে স্বাভাবিক মৃত্যুর আড়ালে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা প্রাচীর বেগম জিয়াকে। একদিকে ছোট ছেলেকে হারনোর শোক আর বড় ছেলের নির্বাসনের কষ্ট, অন্যদিকে লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগতে থাকা আমৃত্যু আপোষহীন এই নেত্রীকে ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও দেয়া হয় নি।

অবশেষে, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ সালে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর ৬টায়, ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী নারী বেগম খালেদা জিয়া। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। সমাপ্ত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের “আপোষহীনতার ৪১ বছরের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়” এর।

লেখক: মো. তৈয়বুল হক, ওমান প্রবাসী সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়