reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৭ মার্চ, ২০২৬

সুশাসন নিশ্চিতকরণ: সকল স্তরে সৎ ও দক্ষ জনবলের অভাব

বাংলাদেশ নতুন করে শুরু করবে এমন আকাঙ্ক্ষা, অভিপ্রায় শুধু ব্যবসায়ীরা ব্যক্ত করছেন তা নয়, দেশের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষ একই কথা মনে করছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন, কল্যাণমুখী নীতি ও আদর্শের পরিবর্তন, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বৈষম্য দূরীকরণ, সুস্থ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার কথা বারংবার মনে করিয়ে দিচ্ছে নতুন সরকারের কান্ডারীসহ সহযোগী সকল নীতি নির্ধারক: মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যাংকার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারী/বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণীপেশার কর্মকর্তা/কর্মচারীগণকে, যাদের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতামূলক সুষ্ঠু রীতিনীতি ও সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে এদেশের রাজনীতির পরিবেশ, অর্থনীতির স্থবিরতা হতে মুক্তি, ভূরাজনীতিতে শক্ত অবস্থান, মানব সম্পদের দক্ষতা, উন্নয়নসহ সুশাসনের সকল মাপকাঠি। দেশ এগিয়ে যাবে কিন্তু কিভাবে এগিয়ে যাবে? যখন সকল পথ স্থবিরতায় হাবুডুবু থাচ্ছে, তখন পরিবর্তিত রূপের ছোঁয়া লাগতে সময়সীমা নির্ধারণ কর্মপরিকল্পনার অংশ হতে পারে পাশাপাশি ভঙ্কুর পাহাড় সদৃশ ঋণের ঝুলি মাথায় নিয়ে অর্থনীতির চাঁকা সচল করতে সৎ, সাহসী, দক্ষ ও যোগ্য মানব সম্পদ গঠনের বিকল্প কোন পথ খুঁজে পাওয়া দায়। সুশাসন নিশ্চিত করতে জনগণের গ্রহনযোগ্য সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক। Concept of Governance বা সরকার পদ্ধতি ধারণাটি হলো-Governance is a Effective tool of Policy Implementation অর্থাৎ পলিসি বাস্তবায়নের জন্য সরকার একটি কার্যকরী রাষ্ট্র যন্ত্র। সাংবিধানিক অচল অবস্থাকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসায় জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ সময়ের দাবি ছিল। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে নতুন তারণ্যের শক্তির উত্থান জেন-জি (Zen-Z), তাদের রক্ত ও বিসর্জন ফলে এদেশের আমূল পরিবর্তনের চাবিকাঠি কাগজে কলমে লিপিবদ্ধ হয়েছে অর্থাৎ সংস্কার বা Reform নামক একটি শব্দ গণতন্ত্রের পথচলায় যুক্ত হয়েছে, সেই শব্দটি হয়তো Concept of Good Governance বা সরকার পদ্ধতির ধারণায় সুনির্দিষ্ট প্রভাব প্রতীয়মান তা হলো Governance is an indicator of progress and reflection of democratic practices অর্থাৎ শাসনব্যবস্থা অগ্রগতির একটি সূচক এবং গণতান্ত্রিক অনুশীলনের প্রতিফলন। গণতান্ত্রিক অনুশীলনে Good Governance Practice & Culture একটি রাষ্ট্রকে সঠিক পথ দেখাতে সহায়তা করে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুশাসনের বিকল্প পথ নেই। সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব, যাদের হাতে ক্ষমতা থাকে। সংবিধান রাষ্ট্রের Regime পরিবর্তন, নতুন সরকার গঠনকে সুরক্ষা দেয়। রাষ্ট্রীয় আচার-আচরণ, বিধি-বিধান সংবিধান অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে যেমনি বহমান তেমনি চালিকা শক্তির শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তও গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত ও মজবুত হতে সহায়তা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সুশাসন ও জবাবদিহিতামূলক সরকারের বাহিরে চিন্তা করার সুযোগ সৃষ্টি না করা, বর্তমান সরকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা দায়িত্ব ও কর্তব্য। নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে দেশের সকল পর্যায়ের সরকারী/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হলে আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা নির্মাণের পথ আরও মসৃণ হবে। সৎ,সাহসী,যোগ্য ও দক্ষ মানব সম্পদ আধুনিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ও চাবিকাঠি। দেশের সকল সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্ন পর্যায় হতে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ে নৈতিকভাবে সংশোধিত হওয়া ও আর্দশগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সকল সূচকে রাষ্ট্রকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন তা কিন্তু নয়। সৎ, যোগ্য ও দক্ষ মানব সম্পদের অভাবে বিগত ৫৫ বছরেও বাংলাদেশ এলডিসির তোকমা হতে বেরিয়ে মধ্য আয়ের দেশে পরিনত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারিনি,উন্নত রাষ্ট্র হওয়া তো দূরের কথা। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী মিডিয়ার সামনে তো বলেই গেছে বেশি লাফালাফি করলে কিন্তু দেশকে যে অবস্থায় পেয়েছিলাম সেই অবস্থায় রেখে দিয়ে চলে যাব।

যেই কথা, সেই কাজই করেছিলেন বিগত আওয়ামী সরকার। সুশাসন দেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য বিষয় হওয়ায় এ ধরণের নিয়ামক ছাড়া কালে ভদ্রে দেশকে পরিচালিত করা গেলেও বৈষম্যবিরোধী সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক সুরক্ষা, নীতিগত পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব না। ঘুষ, দূর্নীতি ও লোপাটের চিত্র সমাজকে যেভাবে কুলষিত করছে তার হাত থেকে দেশকে সুরক্ষা দেওয়ার একমাত্র রক্ষা কবচ হতে পারে সুস্থ, স্বাভাবিক, ন্যায়পরায়ন, সততা ও নৈতিকতার বৈষম্যবিরোধী সমাজ গঠন প্রক্রিয়ায় মনোনিবেশ করা।

বিশেষভাবে যদি অর্থনীতির স্থবিরতা হতে মুক্তির দিকে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এদেশের ভূরাজনীতিও হুমকির মুখে পড়বে। দেশকে দ্বারস্থ হতে হবে বিদেশী শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে যাদের পা-চাটা নীতি উপর নির্ভরশীল হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি এখনই পাবে না।

অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকিং খাতকে ভগ্নদশা হতে মুক্তির লাভের উদ্দেশ্যে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন না করলে ভবিষ্যতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর উপন্যাস “অশনি -সংকেত” মত লুটপাটের রাজনীতি চলতেই থাকবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সুরক্ষায় ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, সৎ জনবলের অভাব দীর্ঘদিন যাবত পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যে যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন খেলাপি ঋণের অপসংস্কৃতি সৃষ্টি করে দেশকে রসাতলে নিয়ে গিছে। মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ। নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটিয়ে সবাই লুটেপুটে নিয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ আত্মসামাজিক উন্নয়নে বা ব্যবসা সম্পসারণে ব্যবহার করা হয়নি, যেমনি সত্য তেমনি এই ঋণের অধিকাংশ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমান দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৬ লক্ষ কোটি টাকা। বিগত সরকারের আমলে দেশ হতে পাচারকৃত অর্থের প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন (বাংলাদেশী টাকায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকা) অর্থাৎ খেলাপি ঋণ ও পাচারকৃত অর্থ যদি জিডিপি ও জিএনপিতে অবদান রাখতো তাহলেও অর্থনীতির ভঙ্কুর দশা হতে মুক্তি লাভের আশায় দীর্ঘদিন অপেক্ষার প্রহর গুনতে হতো না। উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে ঋণ খেলাপি ও পাচার হওয়ার প্রক্রিয়া অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অপসংস্কৃতি এদেশকে শোষিত সমাজ ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করছে, জুয়ার কারবারে পরিণত করেছে। ঋণের ফাঁদে জনগণও আটকে যাচ্ছে । গত ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে শেষে মাথাপিছু দেশি ও বিদেশি ঋণের পরিমান দাঁড়িয়েছে ১.৫০ লক্ষ টাকার অধিক। কেবলমাত্র ৫ হাজার ৭৭৫ গ্রাহকের কাছে রয়েছে ৫০% অর্থের খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশের জনগণ খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কতিপয় দুষ্কৃতিকারী ব্যাংকিং খাতে অপসংস্কৃতি করে কর্মমুখী মানব সম্পদকে বোকা বানিয়ে ধণী শ্রেণীতে পরিণত হচ্ছে। বৈষম্যকারী অবৈধ টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়ার অপসংস্কৃতি মেনে নেওয়া অন্যায়ের সামিল। এ লক্ষ্যে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লুটপাটের সাথে সম্পর্কিত হোঁতাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যদি সম্ভবপর না হয় তাহলে অর্থনীতির অশনি ঘন্টা সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্থ করতেই থাকবে।

ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সাউথ এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত ব-দ্বীপটি ভূরাজনীতে অর্থনৈতিক অঞ্চলের হাব হওয়ার উপযুক্ত স্থানগুলো মধ্যে একটি।

এশিয়ার পরাশক্তিধর রাষ্ট্র- চীন, জাপান, ভারত, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মতো দেশের সুনজর রয়েছে দেশটির প্রতি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বেশ গভীর। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো সবর্দাই সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হওয়ার জন্য কোন কমতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশ যোগ্যতার মাপকাঠিতে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের সদিচ্ছাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, বৈষম্যবিরোধী সমাজ ব্যবস্থা, সমাজের অবহেলিত মানুষের আয় উৎস সৃষ্টি, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি, অর্থনীতি বান্ধব মুদ্রানীতি, পারফরমেন্স বেইজড বাজেটিং, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন, পরিবেশ বান্ধব কর্মসূচী, কূটনৈতিক সুসম্পর্ক নিশ্চিতকরণ জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে পলিসি গঠন করে বাস্তবায়নের পথ উম্মোচিত করতে পারলে দেশকে পিছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার মত দেশি/বিদেশী অপশক্তির অপসংস্কৃতিকে বিনাশ করতে খুব বেশি সময় লাগার কথা না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুদীর্ঘ পথ সুপ্রশস্ত করে সুনিবিড়ভাবে কাজ করতে সৎ, সাহসী, দক্ষ ও যোগ্য লোকের নেতৃত্ব, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিপ্রায়, আশা, ভরসার স্থল বলে মনে করছেন সমাজের সকল শ্রেণীপেশার মানুষ।

লেখক ও গবেষক: মোহাম্মদ আল-এমরান ব্যাংকার, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী। মেইল: [email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়