প্রফেসর ড. মো. আবদুল জলিল
ছাত্র রাজনীতির দৃশ্যপট: বিশ্ব বনাম বাংলাদেশ ঐতিহ্য ও সংকট

বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই তরুণ সমাজ রাজনৈতিক সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ বাহক। কিন্তু “ছাত্র রাজনীতি” বলতে আমরা যা বুঝি, তার প্রকৃতি ও চর্চা দেশভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। কোথাও এটি নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র, কোথাও সামাজিক আন্দোলনের শক্তি, আবার কোথাও এটি সহিংসতা, আধিপত্য ও ক্ষমতার রাজনীতির এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনি এর বর্তমান বাস্তবতা গভীর বিতর্ক ও হতাশারও জন্ম দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে: ছাত্র রাজনীতি কি আজও জাতির বিবেক, নাকি এটি কেবল ক্ষমতার উপনিবেশে পরিণত হয়েছে?
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বরাবরই পরিবর্তনের অনুঘটক। ১৯৬৮ সালের ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন, আমেরিকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম কিংবা চীনের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের আন্দোলন— সবখানেই ছাত্রদের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্র রাজনীতি আরও গভীরভাবে রাষ্ট্র ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালে রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ ছিল প্রথম সারির যোদ্ধা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায়ে ছাত্রদের অবদান অনস্বীকার্য। একসময় ছাত্র রাজনীতি ছিল আদর্শ, ত্যাগ ও গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন সংগ্রামের নাম।
বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনতা রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো দলীয় ছাত্র রাজনীতির আধিপত্য খুব কম দেখা যায়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংগঠন আছে, তবে সেগুলো মূলত: নীতি বিতর্ক, নেতৃত্ব বিকাশ, মানবাধিকার ও পরিবেশ আন্দোলন, শিক্ষানীতি ও ক্যাম্পাস অধিকার রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত থাকে। শিক্ষকদের পদোন্নতি, হল নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার বা ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের সম্পর্ক নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ইস্যুভিত্তিক, দলীয় শক্তিপ্রদর্শনের মাধ্যমে নয়। যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা কানাডায় কোনো ছাত্রসংগঠন যদি সহিংসতায় জড়ায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে রাজনৈতিক চর্চা থাকে, কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সংস্কৃতি তৈরি হয় না।
দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্র রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির সরাসরি সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অঞ্চলে ছাত্রসংগঠনগুলো অনেক সময় মূল রাজনৈতিক দলের “ক্যাডার তৈরির কারখানা” হিসেবে কাজ করে। এ অঞ্চলে ছাত্র রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হলো, আদর্শিক চর্চার চেয়ে ক্ষমতার বলয় তৈরি বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে ক্যাম্পাসে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে প্রভাব বিস্তার, হল দখল, গ্রুপিং ও সহিংসতা প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসের প্রথম অংশ গৌরবের, কিন্তু পরবর্তী অংশ ক্রমেই বিতর্কিত। একসময় ছাত্রনেতা মানেই ছিল সমাজসচেতন, মেধাবী ও আদর্শবাদী তরুণ। কিন্তু ধীরে ধীরে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে: টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সিট বাণিজ্য, হল দখল, দলীয় আধিপত্য, শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত করা, প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি, ভিন্নমত দমন ইত্যাদি নেতিবাচক দিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ, রাজনৈতিক প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ, এমনকি সহিংসতার ঘটনাও বহুবার সামনে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় একাডেমিক যোগ্যতার চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এর ফলে মেধা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতিও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক পদ বণ্টন—সবকিছুতেই দলীয় বিভাজনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশাসন প্রায়ই নিরপেক্ষতা হারায় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের বদলে রাজনৈতিক বলয়ের অংশে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ সেখানে প্রচলিত অর্থে দলীয় ছাত্র রাজনীতি নেই। তবুও তারা সংগঠিত হয়েছে, প্রতিবাদ করেছে, এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করতে দলীয় ছাত্র রাজনীতি অপরিহার্য নয়। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, নেটওয়ার্কভিত্তিক সংগঠন এবং নৈতিক সংহতিই অনেক সময় তরুণদের আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহিংসতা, সেশন জট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার অভিযোগ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে নেপালের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয় ছাত্র রাজনীতির কার্যক্রম সীমিত বা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র থেকে বের করে এনে একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। যদিও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: শিক্ষাঙ্গনের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত শিক্ষা ও গবেষণা, রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনী নয়।
গণতান্ত্রিক সমাজে ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই জরুরি। কারণ আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের নাগরিক, নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্ব। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা আর দলীয় ক্ষমতার রাজনীতি এক জিনিস নয়। একটি আদর্শ ছাত্র রাজনীতি হতে পারে: মানবিক, যুক্তিনির্ভর, সহিংসতামুক্ত, শিক্ষাবান্ধব, সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন। কিন্তু যখন সেটি ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক সুবিধা ও দখলদারিত্বের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন তা শিক্ষাঙ্গনের জন্য হুমকিতে রূপ নেয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাত্র রাজনীতিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়তো সহজ সমাধান নয়। কারণ এর সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য জড়িত। তবে সংস্কার জরুরি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে: ১। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংস রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা; ২। ছাত্রসংগঠনকে একাডেমিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখা; ৩। হল ও প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা; ৪। নিয়মিত ও নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা; ৫। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে দলীয় সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা এবং ৬। ছাত্রনেতাদের জন্য শিক্ষাজীবনের সময়সীমা নির্ধারণ করা ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবের অংশ। কিন্তু ইতিহাসের গৌরব বর্তমানের সব বাস্তবতাকে বৈধতা দেয় না। যে ছাত্র রাজনীতি একদিন গণতন্ত্রের জন্য লড়েছিল, সেটি যদি আজ শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে, তবে তা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সচেতনতা বজায় রেখেও সহিংস ও দলীয় আধিপত্যমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশকেও সেই পথ খুঁজতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যদি জ্ঞানচর্চার বদলে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু শিক্ষা নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎ।
লেখক : শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক ডীন, ফাকাল্টি অফ সাইন্স এবং ফাকাল্টি অফ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিজিএমইএ ইউনিভারসিটি অফ ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজী, ঢাকা








































