মোশাররফ হোসেন মুসা
জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্রনেতাদের সীমাবদ্ধতা

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা না পাওয়ায় ছাত্ররা এখনো দলীয় লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তারপরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি আর মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় রাজনীতি এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা তত্ত্ব ও ইতিহাস নির্ভর। তারা নানা স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। নানা রকম রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে সমাজ পাল্টানোর আকাঙ্খা তাদের বয়সের ধর্ম। তাদের পদচারণা ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক হলেও তাদের জ্ঞানচর্চা জাতীয় ও বৈশ্বিক। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানের সমুদ্র; সেখানে জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যা আলোচনা হয় না। তারা জাতীয় সমস্যা ছাড়াও বৈশ্বিক সমস্যা নিয়েও আন্দোলন করেন। ছাত্ররা তারুণ্যের কারণে ভুলে যান- তাদের বর্ণ, বংশ ও পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কথা। মতাদর্শ যা-ই হোক, আচার-আচরণে সাম্যকে গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। সেজন্য কেউ কেউ গর্ব করে বলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্যান্টিন বয়’ যে কালচার ধারণ করে, তা সাধারণ কলেজের ডিগ্রির ছাত্ররাও সে কালচার ধারণ করে না ( যদিও মাঝেমধ্যে অতীতের কালচারের বিঘ্ন ঘটতে দেখা যায়) । বিশ্ববিদ্যালয় হলো চিরযৌবনা। যারা পড়েন তাদের বয়স ২৫, আর যারা পড়ান তারাও মনেপ্রাণে নিজেদের ২৫ ভাবেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ২৫- এ আটকে থাকে। চিন্তার অস্থিরতায় তারা ভুলে যান- স্থানীয় সমস্যার সমষ্টিই জাতীয় সমস্যা। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নিকটবর্তী তথা স্থানীয় সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। কখনো কখনো দলের আদর্শের চেয়ে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও বংশীয় দ্বন্দ্ব প্রাধান্য পেতে দেখা যায়। গাছতলায় ও চায়ের দোকানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞান চর্চা হয় না। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫/১৬ জন সাবেক ছাত্র নেতা পরাজিত হওয়ার ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে। নব্বই সালে এরশাদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে তারা রাতারাতি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান ।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেউ কেউ এমপি হন। কিন্তু গত ১৫-১৬ বছরে আওয়ামী লীগ বিরোধী ছাত্র নেতারা বিপাকে পড়েন। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকালে কেউ এলাকায় থাকতে পারেন নি। তারা সকলে ঢাকা কেন্দ্রিক হয়ে পড়েন। দীর্ঘসময় এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় জনগণের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টি হয়। যাদের বয়স ১২/১৩ বছর ছিল, তাদের নাম ভোটার তালিকায় লিপিবদ্ধ হয় । তারা নেতাদের নাম শুনেছে; কিন্তু কাছ থেকে দেখে নি এবং স্থানীয় সমস্যাতেও কাছে পায়নি। ফলে তাদের বিকল্প হিসেবে স্থানীয় তরুণ নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় । এবার নির্বাচনে কোনো কোনো এলাকায় তরুণরা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন কিংবা দলের বিরুদ্ধে কাজ করেন। দলীয় কোন্দলে সামান্য ভোটে তারা পরাজিত হন। আবার গ্রামে ‘বড় বাড়ি’ বলে কথা আছে ( যা সামন্ত যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়)। গ্রামের বাড়িতে কেউ থাকেন না; কিন্তু নির্বাচনে ওই বাড়ির সদস্যরাই নির্বাচিত হন। ফারজানা শারমিন পুতুল ও নওসাদ জমির উদাহরণ হতে পারে। নাটোরের ফারজানা শারমিন পুতুল হলেন সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক মন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের কন্যা। আর পঞ্চগড়-১ আসনের নওসাদ জমির হলেন সাবেক স্পীকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দীনের পুত্র।
মজার বিষয় হলো, পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনের মধ্যমনি সারজিস আলম। তিনি প্রায় ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। আবার কুষ্টিয়া চারটি আসনের তিনটিতে জয়ী হয়েছেন জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরা। দৌলতপুর থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির একমাত্র প্রার্থী। এই আসন থেকে প্রায় ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন সাবেক মন্ত্রী আহসানুল হক মোল্লার জ্যোষ্ঠ পুত্র রেজা আহমেদ ওরফে বাচ্চু মোল্লা। তাঁর জয়ী হওয়ার পিছনে পিতার পরিচয়ের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত থাকার সুনাম রয়েছে। তাছাড়া তাঁর ছোট ভাই ইউরোপ ফেরৎ শামীম মোল্লার অবদানও রয়েছে। শামীম মোল্লা ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে বহু মব সন্ত্রাস ঠেকিয়ে বিরোধীদের প্রশংসা পান। অন্যদিকে একসময়কার তুখোড় ছাত্রনেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, হাবিবুর রহমান হাবিব ও নাজমুল হক প্রধান নির্বাচনে পরাজিত হন । হাবিবুর রহমান হাবিব বিএনপি’র প্রার্থী হয়ে মাত্র ১২’শ ভোটে পরাজিত হন কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্না ও নাজমুল হক প্রধান কোনো জোটে না গিয়ে নির্বাচন করে জামানত হারান। তাঁরা ছাত্র জীবনে জাতীয় সমস্যা নিয়ে এতোই নিবিষ্ট ছিলেন যে, কখনো ভাবেন নি একটি স্থানীয় এলাকা থেকে নির্বাচন করে এমপি হতে হবে। অথবা ভাবেননি, কোনো দল বা জোটের অনুকম্পা নিয়ে নির্বাচিত হতে হবেন । যদিও এবার কয়েকজন ছাত্রনেতা বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আবার বাসদের ডা. মনীষা চক্রবর্তী কোনো জোটের সমর্থন না নিয়ে সম্মানজনক ভোট পেয়েছেন। তাঁর সম্মানজনক ভোট প্রাপ্তির পিছনে রয়েছে স্থানীয় মানুষদের সেবা ও পারিবারিক ঐতিহ্য। অর্থ্যাৎ জাতীয়তে তার অবস্থান না থাকলেও সমস্যা নেই, স্থানীয়তে তাঁর শক্ত অবস্থান রয়েছে। অথচ যারা ঢাকায় বসে তত্ত্ব নির্ভর থেকেছেন তাঁরা মাত্র চার-পাচ’শ ভোট পেয়ে আম ও ছালা দু’টিই হারিয়েছেন (সিপিবি’র কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা উদাহরণ হতে পারে)। কাজেই গণতন্ত্র যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে সর্বক্ষণ গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে থাকতে হবে। একই সঙ্গে ভোটের রাজনীতিও মেনে নিতে হবে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতার স্বার্থে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। বড় দলগুলো এ মানসিকতা গ্রহণ করলে রাজনীতি যোগ্য অভিভাবক শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট হবে। তখন ছাত্র রাজনীতিও আপনা-আপনি ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক হয়ে পড়বে।
শেষে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। একটি মফস্বল শহরের পোস্ট অফিস মোড় থেকে প্রতিদিন বিকালে পাঁচ দলের মিছিল বের হতো। মিছিলের ‘শ্লোগান বয়’ ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা টোকন(ছদ্মনাম)। মিছিলটি যখন থানার সামনে যেতো - তখন টোকন শ্লোগান ধরতো ‘ পুলিশ তোরা বেরুস না, পিঠের চামড়া থাকবে না’। আমি একদিন বলি, ‘এটা ইউনিভার্সিটি নয় , পুলিশের বিরুদ্ধে এরকম শ্লোগান দেয়া ঠিক নয় ।’ সে আমার কথায় দ্বিমত করেন এবং বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের দলের কিছু কর্মী থাকতো - একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুল লাগোয়া একটি মেসে। পুলিশ একরাতে সেখানে হানা দেয় এবং বেধড়ক লাঠিচার্জ করে অনেককে আহত করে।
লেখক: গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।









































