মেহেদী হাসান

  ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

আপনার দৃঢ়তা, আপনার নীরব কান্না এই দেশ ভুলবে না

বেগম খালেদা জিয়া (১৯৪৫-২০২৫)

বাংলাদেশ আরও একবার অনাথ হলো। ইতিহাস থমকে দাঁড়াল। নিভে গেলেন একজন নারী, যিনি শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, ছিলেন একটি সময়, একটি সংগ্রাম, একটি অদম্য সাহসের নাম। তিনি বেগম খালেদা জিয়া।

যে মানুষটি বছরের পর বছর রাজপথের কোলাহল, আদালতের কাঠগড়া, কারাগারের নিঃসঙ্গতা আর অসুস্থতার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি নিঃশব্দে চলে গেলেন। কোনো স্লোগান নেই, নেই কোনো প্রতিবাদ। শুধু দীর্ঘশ্বাস আর অশ্রু।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর স্বামী হারানোর বেদনা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। অনেকেই ভেবেছিল এই নারী আর দাঁড়াতে পারবেন না। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে।

যে নারী একদিন রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়াতে সংকোচ বোধ করতেন, তিনিই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন Courage is not the absence of fear, but the triumph over it. অর্থাৎ সাহস মানে ভয় না থাকা নয়, সাহস হলো ভয়কে জয় করা।

খালেদা জিয়া সেই সাহসের জীবন্ত উদাহরণ। গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন এক জীবন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন আবার ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা দেখেছেন। তিনি জানতেন ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গণতন্ত্র চিরস্থায়ী।

কারাগারে থেকেও তিনি আপস করেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও মাথা নত করেননি। এ যেন তাকে ভাঙা যায়, কিন্তু নত করা যায় না।

বাংলাদেশের লাখো মেয়ের চোখে খালেদা জিয়া ছিলেন এক নীরব বিপ্লবের নাম। গৃহিণী থেকেও রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার এক জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি।

হিলারি ক্লিনটন একবার বলেছিলেন Women are the largest untapped reservoir of talent in the world. অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল, অথচ অবহেলিত প্রতিভার উৎস হলো নারীসমাজ।

কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সেই ভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলেন এই দেশের নারীদের জন্য।

শেষ জীবনে তিনি পেয়েছেন অবহেলা, অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা। যে নারী হাজারো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে দেশ চালিয়েছেন, তাকে দেখা গেছে হাসপাতালের বিছানায় নিঃশব্দ, ক্লান্ত, কিন্তু গর্বিত।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘মৃত্যু যদি কিছু দিয়ে যায়, তা হলো ইতিহাস।‘ খালেদা জিয়া সেই ইতিহাস হয়ে গেলেন।

আজ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী চলে যাননি। শেষ হলো একটি অধ্যায়, যেখানে সাহস ছিল, ছিল প্রতিরোধ, ছিল মাথা উঁচু করে বাঁচার শিক্ষা। আজ ঢাকার বাতাস ভারী। স্বামীর কবরের পাশে আরেকটি কবর। যেখানে দুটি ইতিহাস পাশাপাশি শুয়ে থাকবে।

ভালো থাকবেন, মাননীয়া। আপনি চলে গেলেও আপনার ত্যাগ, আপনার দৃঢ়তা, আপনার নীরব কান্না এই দেশ ভুলবে না। কারণ কিছু মানুষ মারা যায় না, তারা ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে।

লেখক : সাংবাদিক

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়