মাসুম বিল্লাহ, শালিখা (মাগুরা)
রঙিন পতাকার ক্যানভাসে ফুটবল প্রেমীদের নান্দনিক প্রকাশ

খেলা শুরু হতে এখনো বাকি ৩ দিন। মাঠে গড়ায়নি ফুটবল। কিন্তু উৎসবের আমেজ ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে মাগুরার শালিখার গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। বাড়ির ছাদ, গাছের মাথা, বাজারের মোড়, পাড়ার ক্লাবঘর এমনকি কৃষকের ক্ষেতের পাশেও উড়ছে নানা দেশের রঙিন পতাকা। কোথাও আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা, কোথাও ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ, আবার কোথাও পর্তুগাল, ফ্রান্স কিংবা জার্মানির পতাকা। ফুটবলপ্রেমীদের এই উচ্ছ্বাস যেন রঙিন পতাকার ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে এক অনন্য নান্দনিকতায়।
ফুটবল বিশ্বে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও বিশ্ব ফুটবলের প্রতি এ দেশের মানুষের ভালোবাসা ঈর্ষণীয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ঘিরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো শালিখাতেও দেখা যাচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
পছন্দের দলের প্রতি সমর্থন জানাতে তরুণরা সপ্তাহখানেক আগে থেকেই শুরু করেন পতাকা তৈরির কাজ। কেউ বাজার থেকে কাপড় কিনে আনেন, কেউ নিজের হাতে রং-তুলি দিয়ে আঁকেন প্রিয় দলের পতাকা। মোড়ে মোড়ে চলছে খেলা দেখার নানা আয়োজন। কেউ কিনছে, বড় টিভি, কেউ ওয়াল টিভি, কেউ আবার প্রজেক্টের দিয়ে খেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
শালিখা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অনেক স্থানে কয়েকশ ফুট দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে উড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। পাড়ায় পাড়ায় চলছে আলোচনা, কে কত বড় পতাকা টাঙাবে কিংবা কার আয়োজন হবে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তবে এই প্রতিযোগিতার মধ্যেও রয়েছে সৌহার্দ্য ও আনন্দের আবহ।
উপজেলা সদর আড়পাড়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের শান্ত কাজী, মেহেদী লস্কর, নাসিম বিশ্বাস, নীরব মোল্যাসহ একাধিক ফুটবলপ্রেমী তরুণ বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপ কিংবা বড় ফুটবল আসরকে উৎসব হিসেবে দেখে আসছি। নিজের দলের পতাকা উড়ালে আলাদা একটা আনন্দ কাজ করে। এটা শুধু সমর্থন নয়, ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় তাই আমরা ৩০ হাত লম্বা একটি আর্জেন্টিনার পতাকা টানিয়েছি।
শুধু তরুণরাই নয়, এই উৎসবে শামিল হন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। অনেক প্রবীণকেও দেখা যায় নিজেদের পছন্দের দলের স্মৃতি রোমন্থন করতে। শিশু-কিশোররা প্রিয় দলের পতাকার টি শার্ট গায়ে লাগিয়ে মাতাচ্ছেন পুরো এলাকা। রংবেরঙের পতাকার রঙে সাজিয়ে তুলছে নিজেদের চারপাশ। দেখে মনে হচ্ছে ফুটবল উৎসব যেন একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে আবেগের সেতুবন্ধন তৈরি করছে।
এদিকে পতাকা তৈরির এই সংস্কৃতি স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসারও সুযোগ সৃষ্টি করছে। কাপড় ব্যবসায়ী, রং বিক্রেতা ও ব্যানার নির্মাতাদের ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। অনেক তরুণ নিজ হাতে পতাকা তৈরি করে বিক্রি করছেন, যা তাদের জন্য বাড়তি আয়ের পথও খুলে দিচ্ছে।
খেলাধুলা মানুষের মধ্যে সামাজিক সংযোগ ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। ফুটবলকে ঘিরে পতাকা উৎসবও সেই সম্প্রীতিরই বহিঃপ্রকাশ। যদিও মাঝে মাঝে সমর্থকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা দেখা যায়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আনন্দ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকে বলেই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
শালিখার বিভিন্ন এলাকায় উড়তে থাকা রঙিন পতাগুলো যেন একটি বার্তাই দেয়, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষের অনুভূতি, ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক চর্চারও অংশ। মাঠের খেলা হাজার মাইল দূরে হলেও তার আবেগ ছুঁয়ে যাচ্ছে এখানকার প্রত্যন্ত জনপদকে। বাতাসে দোল খাওয়া এসব পতাকা তাই শুধু কাপড়ের টুকরো নয়, এগুলো ফুটবলপ্রেমীদের স্বপ্ন, আবেগ ও নান্দনিক প্রকাশের প্রতীক। শালিখার আকাশে উড়তে থাকা রঙিন পতাকাগুলো যেন জানান দিচ্ছে, খেলা শুরু হওয়ার আগেই বেজে উঠেছে বিশ্বকাপের সাইরেন আর তাই বাহারী রঙের পতাকায় ফুটছে ফুটবল প্রেমীদের ভালোবাসার ক্যানভাস।
পিডিএস/এমএইউ









































