মাওলানা মিজান মাহমুদ

  ২৫ মে, ২০২৬

কোরবানি : ইতিহাস বিবর্তন ও তাৎপর্য

বছর ঘুরে আবারও আমাদের সামনে উপস্থিত পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য স্মারক কুরবানি। জিলহজ মাসের নির্ধারিত দিনগুলোতে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানি আদায় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মানবমনের গভীরে নিহিত ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির বহিঃপ্রকাশ।

কুরবানির এই বিধান যুগে যুগে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় ত্যাগের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত প্রতীকী রূপ লাভ করে। ইসলামের দৃষ্টিতে কুরবানি কোনো রক্ত-মাংসের উৎসর্গ নয়; বরং এটি মানুষের অন্তরের বিশুদ্ধতা, আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং আত্মত্যাগের মানসিকতার এক গভীর অনুশীলন। নবীজি (সা.) তার জীবদ্দশায় কখনো কুরবানি ত্যাগ করেননি। এমনকি তার মৃত্যুর পরও তার পক্ষ থেকে কুরবানি করার জন্য আলি (রা.)-কে অসিয়ত করেছিলেন।

কোরবানির তাৎপর্য

কুরবানি অর্থ নৈকট্য লাভ করা। শরিয়তের পরিভাষায় কুরবানি বলা হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় এবং দুনিয়ায় বান্দার ওপর আরোপিত বিধান থেকে কুরবানি করার মাধ্যমে নিষ্কৃতি লাভ করা। কুরবানির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর প্রতি তার বান্দার আনুগত্য ও তাকওয়া। কুরবানির বিধান দেওয়া হয়েছে, যাতে করে বান্দা কুরবানির সময় বেশি বেশি আল্লাহর নাম স্মরণ করে এবং অন্তরে এ কথা বদ্ধমূল করে নেয় যে, তিনিই আমাদের রব এবং রিজিকদাতা। হজরত জুরাইজ (রহ.) বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে লোকেরা তাদের উৎসর্গকৃত পশুর গোশত নিজেরা খাওয়ার জন্য রেখে দিত এবং ওর রক্ত ঘরে ছিটিয়ে দিত।

এ কথা শুনে সাহাবিরা বললেন, তাদের চেয়ে আমাদেরই এরূপ করার অধিকার বেশি। তখন আল্লাহ তায়ালা নাজিল করলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না ওসব প্রাণীর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া’ (সুরা হজ : ৩৭)।

অর্থাৎ আমাদের জবাইকৃত পশুর গোশত কিংবা রক্ত কোনোটাই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং আমাদের অন্তরে কী আছে সেটা আল্লাহর কাছে পৌঁছে। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের উচিত হলো নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা।

পৃথিবীর প্রথম কোরবানি

পৃথিবীতে মানবজাতির প্রায় সব অংশেই এবং সব ধর্মেই কুরবানি প্রথার দেখা মেলে। কুরবানির ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই কুরবানির বিধান প্রচলিত। প্রথম কুরবানি সংঘটিত হয় তার দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে। তখন কুরবানি কবুল হওয়া না হওয়া ছিল স্পষ্ট। যার কুরবানি কবুল হতো আসমান থেকে এক টুকরো অগ্নিশিখা এসে তার পশুকে জ্বালিয়ে দিত। হাবিল ও কাবিল উভয়ে প্রভুর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কুরবানি পেশ করল।

হাবিল ছিল মেষ পালক, তাই সে একটি বকরি কুরবানি হিসেবে পেশ করে। কাবিল ছিল কৃষক, তাই সে কিছু শস্যদানা পেশ করল। কিন্তু কাবিল ভালো শস্যদানা রেখে খারাপ শস্যদানা কুরবানি হিসেবে পেশ করে। আল্লাহ তায়ালা হাবিলের কুরবানি কবুল করেন, তাই আসমান থেকে অগ্নিশিখা এসে তার পশুটি জ্বালিয়ে দিল। পক্ষান্তরে কাবিলের কুরবানি কবুল হয়নি বিধায় তার শস্যদানা পড়ে থাকল।

এটিই ছিল ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানি, যার বর্ণনা কুরআনে পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি তাদের আদমের পুত্রদ্বয়ের বাস্তব ঘটনা পাঠ করে শোনান। যখন তারা আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশে কুরবানি নিবেদন করল, তখন তাদের একজনের কুরবানি কবুল করা হলো আর অপরজনের কবুল করা হলো না। সে (কাবিল) বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। সে (হাবিল) বলল, আল্লাহ আত্মসংযমীদের কুরবানি কবুল করেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ২৭)

কোরবানির বিধান বিবর্তন

জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আজহার নির্ধারিত দিন। মূলত ১০ জিলহজ এক বরকতময় ও ঐতিহাসিক দিন। সেদিন ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে বৃদ্ধ বয়সে পাওয়া সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে তার সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরবানি করতে উদ্যত হন। ইবরাহিম (আ.) নিজের সন্তানের গলায় ছুরি চালিয়ে আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগ ও আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাইল (আ.)-কে নিরাপদ রেখে তার স্থলে একটি পশু কুরবানির ব্যবস্থা করেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(ইবরাহিম বললেন) হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।’ এরপর আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম বলল, ‘বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে জবাই করছি; এখন তোমার অভিমত কী বলো?’

সে বলল, ‘হে আমার বাবা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম তাকে কাত করে শায়িত করল, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে।’ এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক কুরবানির বিনিময়ে (সুরা সাফফাত : ১০০-১০৭)।

মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-এর এই কাজকে তার প্রেমের প্রতীক হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত অনুসরণীয় আদর্শ সাব্যস্ত করেছেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি একে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। ইবরাহিমের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।’ (সুরা সাফফাত : ১০৮-১০৯)

উম্মতে মুহাম্মদির জন্য কোরবানি

নবীজি (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর ঈদুল আজহার নামাজ ও কুরবানির বিধান অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানি করুন’ (সুরা কাউসার : ২)।

হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, আয়াতে ঈদুল আজহার নামাজ এবং কুরবানি বোঝানো হয়েছে (আহকামুল কুরআন : ৩/৪৭৫)।

বদর যুদ্ধের পর গাজওয়ায়ে সাবিক (ছাতুর যুদ্ধ) নামে রক্তপাতহীন একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। দ্বিতীয় হিজরির জিলহজ মাসের ৯ তারিখে রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন এবং পরের দিন ১০ জিলহজ দুই রাকাত ঈদের নামাজ আদায় করেন।

নামাজ শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে দুটি ভেড়া কুরবানি করেন এবং মুসলমানদের কুরবানি করার নির্দেশনা দেন। এটিই ছিল আমাদের নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমে সংঘটিত এই উম্মতের ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। (সিরাতুল মুসতাফা : ২ / ১৭১)

কেমন ছিল নবীজি (সা.)-এর কোরবানি

নবীজি (সা.) প্রতি বছর কুরবানি করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার ১০ বছর জীবনের প্রতি বছরই কুরবানি করেছেন’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৭)। নবীজি (সা.) ঈদগাহেই কুরবানির পশু জবাই করতেন।

উট, গরু ও ভেড়া- সবই কুরবানি করতেন তিনি। নিজেই জবাই করতেন। প্রখ্যাত তাবেয়ি হজরত নাফে (রহ.) ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহে কুরবানির পশু জবাই করতেন এবং নাহর (উটের কুরবানি) করতেন (বুখারি : ৫৫৫২)।

নবীজি (সা.) সাধারণত প্রতি বছর দুটি ভেড়া জবাই করতেন। একটি নিজের জন্য, অন্যটি উম্মতের জন্য। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করিম (সা.) দুটি ভেড়া কুরবানি দিতেন। আমিও দুটি ভেড়া কুরবানি দিতাম’ (বুখারি : ৫৫৫৩)।

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কুরবানি করতে ইচ্ছা করতেন, তিনি শিংবিশিষ্ট, মোটাতাজা দুটি খাসি বা ভেড়া কুরবানি দিতেন। এর একটি তিনি ওইসব উম্মতের জন্য কুরবানি করতেন, যারা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেবে ও তার দায়িত্ব পালনের কথা স্বীকার করবে। অন্যটি তিনি নিজের ও তার পরিবারের নামে জবাই করতেন’ (ইবনে মাজাহ : ৩১২২)।

হজের সময় মহানবী (সা.) স্ত্রীদের জন্য কুরবানি করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে জিলকদের ২৫ তারিখে বের হলাম, তখন আমরা হজের নিয়ত করেছি। যখন আমরা মক্কার কাছে গেলাম তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মধ্যে যারা হাদির (হজে জবাইয়ের জন্য পশু) প্রাণী আনেনি, তাদের ইহরাম খুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন আমাদের মধ্যে কুরবানির দিন গরুর গোশত বিতরণ করা হলো। আমি (বাহককে) বললাম, এটা কী? বাহক বলল, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছেন’ (বুখারি : ১৭০৯)।

বিদায় হজে মহানবী (সা.) ‘দমে শোকর’ হিসেবে ১০০ উট কুরবানি করেছেন। ৬৩টি উট তিনি নিজে জবাই করেছেন আর বাকিগুলো হজরত আলি (রা.) জবাই করেছেন। মহান আল্লাহ সবাইকে নবীজি (সা.)-এর অনুসরণে কুরবানি করার তওফিক দিন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়