খলিলুর রহমান

  ৪ ঘণ্টা আগে

দুর্যোগে সেবাদানে সমন্বয়হীনতা ভুক্তভোগীর সমস্যা বাড়ায়

* ১৫ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও সবজি নষ্ট হয়েছে * নিরাপদ পানির উৎস, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও স্যানিটেশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে

গত কয়েক দিনে জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড় ধসের আশঙ্কার পূর্বাভাস সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগেই জানিয়েছিল। এ ছাড়া আমাদের দেশে একটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, নানাপ্রকার প্রকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্ধার ও সেবাদানের কাছে নিয়োজিত সরকাররি বেসেরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রায়ই সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। এ কারণে ভুক্তভোগীদের সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায়।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা ৫৬ জনে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং ১০ জেলায় প্রায় ১৫ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শত শত ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে বহু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি নষ্ট হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবাদিপশুর খামার, যোগাযোগব্যবস্থা : বহু সড়ক, সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষদিগ্রস্ত হয়েছে। নিরাপদ পানির উৎস, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও স্যানিটেশনব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। দেশের কৃষি অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বার্তা এবং দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে ওঠে এসেছিল জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সতর্কবার্তাগুলো কি মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতিতে রূপ পেয়েছিল? সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরটি আশাব্যঞ্জক নয়। বরং দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।

সংবাদ বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস মিলিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আগেই তাদের ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোথাও বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হলো পাহাড় ধসে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি।

এই মৃত্যু শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; এটি প্রস্তুতির ঘাটতিরও নির্মম প্রতিচ্ছবি।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দুর্যোগ প্রতিরোধ করা না গেলেও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব, যদি আগাম প্রস্তুতি যথাযথভাবে নেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী আগে থেকেই মজুদ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় উদ্ধার নৌকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জরুরি সেবাদল অনেক জায়গায় সময়মতো সক্রিয় হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল প্রকট। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল আশ্রয়কেন্দ্রের প্রস্তুতি। অনেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও সেগুলো সময়মতো খুলে দেওয়া হয়নি কিংবা প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও চিকিৎসাসেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। কোথাও আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আবার কোথাও সাধারণ মানুষ আগাম সতর্কবার্তা বা নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশনা যথাসময়ে পাননি।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত একটি দেশ। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং আশ্রয়কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনায় দেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কিন্তু বন্যা ও পাহাড় ধসের মতো দুর্যোগে একই দক্ষতা এখনো গড়ে ওঠেনি।

কিন্তু যা হবার কথা নয়, সেটাই হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়, কর্মপরিকল্পনা এবং সমন্বয়হীনতার দৃশ্য বারবার সামনে চলে আসে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এমন পরিস্তিতিতে একটি কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আবহাওয়া অধিদপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি থাকলেও বরাবরই সংস্থাগুলোর উদাসীনতা ফুটে উঠেছে।

কেবল পূর্বাভাস প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; সেই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে কী প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম যতটা প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি। আগাম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত ত্রাণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম মজুদ রাখা, পাহাড় ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে স্থানান্তর করা এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার মতো পদক্ষেপ আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। তাই দুর্যোগকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, যেখানে পূর্বাভাস শুধু সংবাদ হয়ে থাকবে না, বরং দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগে রূপ নেবে। পাহাড় ধস, বন্যা কিংবা অতিবৃষ্টিতে আর একটি প্রাণও যেন প্রস্তুতির অভাবে হারাতে না হয় এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকার। কারণ দুর্যোগ অনেক সময় অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু অব্যবস্থাপনা কখনোই অনিবার্য হতে পারে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের বন্যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ের অভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যর্থতা এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্বের কারণেই ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। তারা বলছেন, এবারের বন্যা, পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতা আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে দুর্যোগ কেবল প্রাকৃতিক নয়, এর ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশই মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফল। কাজেই দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদেরকে আরো প্রস্তুতি মূলক ও দূরদর্শী হতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের দুর্যোগ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে, আগাম সতর্কবার্তা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা দ্রুত ও সমন্বিতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে আরো কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা। নদী-খাল দখল মুক্তকরা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ বন্ধকরা। আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধার ব্যবস্থার বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধারে দ্রুত আর্থিক সহায়তা, সহজ ঋণ এবং কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, জনসচেতনতা ও স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোর অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে এমন মানবিক বিপর্যয় পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। আমরা মনেকরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা বা এজাতীয় দুর্যোগের ফলে মানবিক বিপর্যয় এড়াতে সরকার আগে থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন, যাতে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়ানো যায়।

লেখক, সাংবাদিক

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়