অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

  ৫ ঘণ্টা আগে

শেয়ারবাজার : কীভাবে কাজ করে ‘গোপন সিন্ডিকেট’

শেয়ারবাজারে কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ কয়েক দিনে ৩০, ৫০ কিংবা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অথচ কোম্পানির ব্যবসা, মুনাফা বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন থাকে না। আবার অনেক সময় লোকসানি, উৎপাদন বন্ধ কিংবা দীর্ঘদিন লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানির শেয়ারও অস্বাভাবিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়। প্রশ্ন ওঠে- এমনটা কীভাবে সম্ভব?

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে কাজ করে শেয়ারবাজারে কারসাজি (মার্কেট ম্যানুপুলেশন)। এটি এমন একটি অবৈধ প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যক্তি বা একটি সংঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিমভাবে কোনো শেয়ারের চাহিদা, সরবরাহ কিংবা মূল্যকে প্রভাবিত করে নিজেদের মুনাফা নিশ্চিত করে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক সময়ে ঝিল বাংলা সুগার মিলস, শ্যামপুর সুগার মিলস, সোনারগাঁও টেক্সটাইলসহ কয়েকটি দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে কারসাজির বিষয়টিকে আলোচনায় এনেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে- শেয়ারবাজারে কারসাজি আসলে কী, কীভাবে এটি পরিচালিত হয় এবং কেন এটি রোধ করা কঠিন?

কারসাজি আসলে কী : শেয়ারবাজারে প্রতিটি শেয়ারের দাম স্বাভাবিকভাবে নির্ধারিত হওয়ার কথা ক্রেতা ও বিক্রেতার প্রকৃত চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য, গুজব, কৃত্রিম লেনদেন বা গোপন তথ্যের অপব্যবহার করে সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে, তখন সেটিই বাজার কারসাজি। অর্থাৎ বাজারে যে মূল্য দেখা যাচ্ছে, সেটি প্রকৃত ব্যাবসায়িক অবস্থার প্রতিফলন নয়; বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা একটি মূল্য। এই কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যপতনের সুযোগ নিয়ে কারসাজিকারীরা বিপুল মুনাফা করে, আর শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

কীভাবে কাজ করে কারসাজি চক্র : বাজার-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কারসাজি চক্র সাধারণত কয়েকটি ধাপে কাজ করে। প্রথমে তারা এমন একটি কোম্পানি নির্বাচন করে, যার বাজার মূলধন তুলনামূলক কম, শেয়ারের সংখ্যা সীমিত অথবা কোম্পানিটি দীর্ঘদিন লোকসান করছে। এরপর ধীরে ধীরে কম দামে বিপুল পরিমাণ শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

পরবর্তী ধাপে শুরু হয় কৃত্রিম চাহিদা তৈরির খেলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপ, মেসেজিং অ্যাপ কিংবা ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানা গুঞ্জন- কাম্পানিতে বড় বিনিয়োগ আসছে, নতুন প্রকল্প চালু হচ্ছে, বড় লভ্যাংশ আসবে কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনছে।

এই গুজবে প্রভাবিত হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনা শুরু করলে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। দাম যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন কারসাজি চক্র তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে বিপুল মুনাফা নিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর কৃত্রিম চাহিদা শেষ হয়ে গেলে শেয়ারের দাম দ্রুত পড়ে যায় এবং ক্ষতির ভার বহন করতে হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

সবচেয়ে পরিচিত কৌশল ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ : বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে পরিচিত কারসাজির কৌশল হলো ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’। এ পদ্ধতিতে প্রথমে একটি শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে সেই শেয়ার নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়, যাতে সাধারণ মানুষ শেয়ারটি কিনতে উৎসাহিত হন। যখন দাম অনেক বেড়ে যায়, তখন কারসাজিকারীরা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দেয়। এরপর বাজারে বিক্রির চাপ বাড়লে শেয়ারের দাম ধসে পড়ে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অতীতের অনেক আলোচিত কারসাজির ঘটনায় এই কৌশলের মিল পাওয়া গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ওয়াশ ট্রেডিং : নিজেরাই কেনেন, নিজেরাই বিক্রি করেন : আরেকটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো ওয়াশ ট্রেডিং বা সার্কুলার ট্রেডিং। এ ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কোনো মালিকানা পরিবর্তন হয় না। একই ব্যক্তি বা একই সিন্ডিকেটের সদস্যরা একাধিক বিও হিসাব ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যেই একই শেয়ার বারবার কেনাবেচা করেন। ফলে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, ওই শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এই ভুয়া চাহিদা দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কিনতে শুরু করেন।

ইনসাইডার ট্রেডিং : গোপন তথ্য দিয়ে মুনাফা : শেয়ার বাজারে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মগুলোর একটি হলো ইনসাইডার ট্রেডিং। কোম্পানির পরিচালক, কর্মকর্তা, অডিটর বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনেক সময় মূল্য সংবেদনশীল তথ্য, যেমন- বড় লভ্যাংশ, বড় চুক্তি, একীভূতকরণ, লোকসান কিংবা নতুন প্রকল্পের তথ্য- সাধারণ মানুষের আগে জেনে যান।

যদি সেই তথ্য প্রকাশের আগেই তারা নিজেরা বা তাদের ঘনিষ্ঠরা শেয়ার কেনাবেচা করেন, তাহলে তা ইনসাইডার ট্রেডিং হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সমান তথ্য পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

ভুয়া অর্ডারের ফাঁদ : আধুনিক পুঁজিবাজারে আরেকটি পরিচিত কারসাজির কৌশল হলো স্পুফিং ও লেয়ারিং। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের শেয়ার কেনা বা বিক্রির ভুয়া অর্ডার দেওয়া হয়, যাতে অন্য বিনিয়োগকারীরা মনে করেন বাজারে বড় ধরনের চাহিদা বা বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। বাজারে কাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ভুয়া অর্ডার বাতিল করে দেওয়া হয়।

কেন টার্গেট হয় দুর্বল কোম্পানি : বিশ্লেষকদের মতে, কারসাজিকারীরা সাধারণত শক্তিশালী নয়, বরং দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিকেই বেশি টার্গেট করে। বিশেষ করে জেড শ্রেণিভুক্ত, উৎপাদন বন্ধ, দীর্ঘদিন লোকসান করা বা কম মূলধনি কোম্পানির শেয়ার সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কারণ এসব কোম্পানির বাজারে অবাধে লেনদেনযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে তুলনামূলক কম অর্থ দিয়েই একটি চক্র বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ঝিল বাংলা সুগার মিলসের মতো দীর্ঘদিনের লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। কোম্পানিটির ব্যবসায়িক অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না থাকলেও মাত্র কয়েক কার্যদিবসে শেয়ারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। পরে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সাময়িকভাবে শেয়ারটির লেনদেন স্থগিত করে।

পুরোনো কৌশল, নতুন রূপ পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, কারসাজির ধরন বদলালেও মূল কৌশল একই রয়েছে। আগে গুজব ছড়ানো হতো মুখে মুখে, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গ্রুপ ও মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই হাজারো বিনিয়োগকারীর কাছে পৌঁছে যায়।

কখনো দাম আগে বাড়ে, পরে কোম্পানি কোনো ইতিবাচক তথ্য প্রকাশ করে। আবার কখনো তথ্য প্রকাশের আগেই একটি নির্দিষ্ট চক্র সেই তথ্যের সুবিধা নিয়ে অবস্থান তৈরি করে ফেলে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবসময়ই পিছিয়ে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, অতীতে শেয়ার বাজারে কারসাজির ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটলেও বর্তমানে অটোমেশন ও কম্পিউটারভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সেই সুযোগ অনেকটাই কমে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু চক্র এখনো কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো বা কমানোর চেষ্টা করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বর্তমান কমিশন যেকোনো ধরনের কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে শুধু কারসাজি দমন করলেই হবে না, বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

আবু আহমেদের মতে, শেয়ার বাজারকে শক্তিশালী ও গভীর করতে হলে বাজারে আরো বেশি মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও সুশাসনসম্পন্ন কোম্পানি আনতে হবে। বিশেষ করে বড় ও ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘শুধু প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে চলবে না। প্রয়োজন হলে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মতো বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে ভালো কোম্পানিগুলোকে দ্রুত বাজারে আনা উচিত। এতে বাজারের গভীরতা বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাজার আরো স্থিতিশীল হবে।’

নিয়ন্ত্রকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ : পুঁজিবাজারে কারসাজি রোধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নজরদারি জোরদারের কথা বলছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর রিয়েল-টাইম নজরদারি, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধিতে দ্রুত ব্যবস্থা, জেড শ্রেণিভুক্ত কোম্পানির ওপর বিশেষ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক লেনদেন স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারও শেয়ার বাজারে অতীতের বড় ধরনের কারসাজির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্যদাতাদের (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষার মতো উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা : বিশ্লেষকদের মতে, কোনো শেয়ারের দাম হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেই সেটিকে ভালো বিনিয়োগ মনে করার সুযোগ নেই। বরং এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, মুনাফা, লভ্যাংশ, নগদপ্রবাহ, মূল্য-আয় অনুপাত (পি/ই), ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা এবং মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ যাচাই করা জরুরি। কারণ, শেয়ার বাজারে কারসাজির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- শুরুর দিকে এটি লাভের সুযোগ বলে মনে হলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীই ক্ষতির মুখে পড়েন। আর এ কারণেই একটি স্বচ্ছ, তথ্যনির্ভর ও কঠোর নজরদারির পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়