তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
ঐতিহাসিক বেহুলা সুন্দরীর জিয়ন্ত কূপ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ষোলশ শতাব্দীর প্রাচীন লোককাহিনির সেই বেহুলা সুন্দরীর জিয়ন্ত কূপটি প্রাচীন ঐতিহ্যর নিদর্শন ও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরিচর্যার অভাবে অবহেলায় ও অযত্নে জর্জরিত নির্দশনটি। যদিও কূপটি দেখতে দর্শনার্থীর ঢল প্রতিনিয়ত।
তথ্যমতে জানা যায়, উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের তৎকালীন নিচানী বাজার বর্তমানে বিনসাড়া গ্রামে বাছোবানিয়ার একমাত্র সুন্দরী কন্যা ছিলেন বেহুলা সুন্দরী। বেহুলা সুন্দরীর বাড়ি এবং জিয়ন্ত কূপ এখনো ইতিহাসের স্মৃতি বহন করছে।
এ গ্রামে ঐতিহাসিক নিদর্শন, অসংখ্য পুরোনো মন্দির, দালানকোঠা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। চাঁদের বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই খালটি আজও আছে। বিনসাড়া গ্রামের প্রবীণ লোকজনের মতে, বেহুলার খাড়ির (খাল) অল্প দূরে বড় একটি ইন্দারা (কূপ) রয়েছে। এটিই লোকমুখে বেহুলার কূপ নামে পরিচিত। আর এ পাড়া বেহুলাপাড়া নামে পরিচিত। বিনসাড়া গ্রাম ছিল বেহুলার বাবা বাছোবানিয়ার (মায়া সওদাগর) বাড়ি। অতীতে চলনবিলের এ এলাকা ছিল অরণ্যে ঢাকা। একঘর থেকে আরেক বসতি ছিল অনেক দূরে। লোকমুখে এখনো শোনা যায়, এখানে ছিল বেহুলা সুন্দরীর বাড়ি।
জনশ্রুতি আছে বেহুলার বাড়ি বৃহত্তর সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস ইউনিয়নের এ বিনসাড়া গ্রামে। প্রাচীন নাম নিচানীনগর। লখিন্দরের বাড়ি বগুড়ার মহাস্থানগড়ের কাছে চম্পকনগরে। অপভ্রংশ হয়ে হয়েছে চাঁদপুর। এ গ্রামের চাঁদ সওদাগরের ছেলে লখিন্দর। বগুড়ার চম্পকনগরে সেসব স্মৃতিচিহ্ন নেই। তবে বিনসাড়ায় মুছে যায়নি বেহুলার স্মৃতিচিহ্ন। অবশ্য মহাস্থানগড়ের কাছে গোকুল এলাকায় প্রাচীন একটি উঁচু ঢিবি ‘বেহুলার বাসরঘর’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে বহুকাল থেকে। এ ঢিবি কীভাবে বেহুলার বাসরঘরের পরিচিতি পেল তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। গত শতাব্দীর মধ্যভাগের পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এ ঢিবিটিকে বৌদ্ধদের উপাসনালয় বলে জানায়।
অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিস সূত্রে জানা যায়, বিনসাড়া গ্রামের বেহুলার বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পেছনে রয়েছে একটি বড় ইন্দারা! লোকে বলে বেহুলার কূপ। ভেতরটা ঝড়জঙ্গলে ভরে গেছে। কিছুটা পরিষ্কার করে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ইন্দারাটি পাকা করে উপরে ছাউনি দেওয়া হয়েছে। কৌতূহলী মানুষ দেখতে যায়। বেহুলার খাড়ি ও বেহুলার কূপ নামে পরিচিত ওই স্থানটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে প্রত্ননিদর্শন হিসেবে খাতায় ওঠেনি। গবেষকদের মতে, বেহুলা-লখিন্দরের অস্তিত্ব ছিল। ইতিহাসের খেরোখাতায়
লোকজ সাহিত্যে বেহুলা-লখিন্দরের অস্তিত্ব প্রণয় থেকে পরিণয় পর্যন্ত আছে। এরপর লোহার বাসরে মনসা দেবীর সাপের রূপ ধরে অভিশপ্ত লখিন্দরের পায়ে দংশন, বেহুলার নৃত্যে দেবীর সন্তুষ্টি, লখিন্দরের প্রাণ ফিরে পাওয়া এগুলো প্রাচীন লোকগাথার কাল্পনিক উপাখ্যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাড়াশের বিনসাড়া গ্রামে বসতি ছিল বাছোবানিয়া বা মায়া সওদাগরের। তারই একমাত্র কন্যা বেহুলা। রূপেগুণে অদ্বিতীয়া। প্রমথনাথ বিশি ও রাখাল দাসের বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থে মায়া সওদাগর ও তার অপরূপ কন্যা বেহুলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বগুড়ার চম্পকনগরে আরেক সওদাগরের বাড়ি। নাম চাঁদ সওদাগর। তার ছেলেই লখিন্দর। চলনবিলের দক্ষিণ প্রান্তে বেহুলা আর উত্তর প্রান্তে সুদর্শন লখিন্দর বড় হতে থাকে। মায়া সওদাগর ও চাঁদ সওদাগরের ব্যবসারও প্রসার ঘটে। নৌপথে চলাচলের একপর্যায়ে লখিন্দরের বজরা ভেড়ে বেহুলাদের বিনসাড়া গ্রামের কাছে। দেখা মেলে এক অপরূপ সুন্দরীর। লখিন্দর সেখানে চাঁদের বাজার স্থাপন করেন। এরপর বেহুলা-লখিন্দরের প্রণয় উপাখ্যান প্রাণ পায় পরিণয়ের পিঁড়িতে। পৌরাণিক উপাখ্যানে বেহুলার বাবা মায়া সওদাগর ছিলেন সর্পদেবী মনসার পূজারী।
অপরদিকে লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগর মনসাকে মানতেন না। এতে ক্ষুব্ধ হয় মনসা দেবী। সিদ্ধান্ত নেয় বাসর রাতেই লখিন্দরকে দংশন করবে। চাঁদ সওদাগর ছেলের জন্য লোহার বাসরঘর নির্মাণ করেন। মনসার কারসাজিতে বাসরঘর তৈরির কারিগরকে নির্বংশ করার হুমকি দেয় সর্পদেবী মনসা। ভয়ে ছোট্ট ছিদ্র রাখে কারিগর। বাসরঘরে সুযোগ বুঝে লখিন্দরকে দংশন করে সর্পদেবী। চলনবিলের এ উপাখ্যান ইতিহাসে নেই। এদিকে মৃত স্বামীকে বাঁচাতে কলার ভেলায় চলনবিলের এতটা পথ পেরিয়েছে বেহুলা, জানে না কেউ।
বিনসাড়া গ্রামের লোকজন বলেন, সেখানে বেহুলার বাবার তিনশ ষাটটি পুকুর ছিল। ৪০ বিঘা জমিজুড়ে ছিল মায়া সওদাগরের ভিটা। বড় একটি ইন্দারা আজও বেহুলার বাবার স্মৃতি বহন করছে। আছে বেহুলার কূপ। যে ঘাটে লখিন্দরের ময়ূরপঙ্খি বজরা ভিড়ত, তা শুকিয়ে এখন ছোট্ট খাল। বেহুলার খাড়ি আর ধারের চাঁদের বাজার আজও আছে। বেহুলার পৈতৃক ভিটা, বিনসাড়া সরকারি প্রাথমিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, ভূমি অফিস, বাজার, ঘরবাড়ি সবই আছে। লোকজন জানে এটাই বেহুলার বাড়ি। বিনসাড়া প্রাইমারি স্কুলের নামফলকে লেখা ছিল ‘ঐতিহাসিক বেহুলার বাড়ি’। এ এলাকায় আছে অনেক ভূ-সম্পদ যা সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এলাকাবাসী।
"









































