গাজী মোঃ শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জে ছয় মাসে ১২০ আত্মহনন, বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী

সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন—মাত্র ছয় মাসে জেলায় শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীসহ ১২০ জন অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। গড়ে প্রতি মাসে ২০ জন এবং সপ্তাহে প্রায় ৫ জন আত্মহত্যা করছেন। স্বজনদের কান্না আর অপূরণীয় ক্ষতির এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে এক গভীর সামাজিক সংকটের।
আত্মহত্যার চিত্র ও বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান: জেলা পুলিশের তথ্যানুযায়ী, মৃত ১২০ জনের মধ্যে ৬৮ জন পুরুষ এবং ৫২ জন নারী। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। তবে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীদের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে, যা চিন্তার বিষয়।
কেন এই চরম পথ: বিশেষজ্ঞ ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, দারিদ্র্য, দেনার চাপ, প্রেমে ব্যর্থতা, পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে না পারা, সামাজিক অপমান, সাইবার বুলিং ও গভীর মানসিক হতাশা মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাজ ও আইনজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
একাকীত্ব ও যৌথ পরিবারের অভাব: রজব আলী মেমোরিয়াল বিজ্ঞান কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. বাবুল হোসেন জানান, একক পরিবারের বিস্তার ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে তরুণরা মনের কষ্ট চেপে রাখছে। অভিভাবকরা শুধুই পড়ালেখা ও ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছেন, কিন্তু সন্তানের মানসিক অবস্থার খবর রাখছেন না।
আইনি ও সামাজিক সহযোগিতার অভাব: সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির কর্নেল বলেন, অর্থনৈতিক চাপ ও পারিবারিক সহিংসতায় মানুষ আইনি বা সামাজিক সহায়তার বদলে আবেগপ্রবণ হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
সামাজিক দূরত্বের প্রভাব: শহরের প্রবীণ বাসিন্দা মো. বাবলু আফসোস করে জানান, আগে বিপদে প্রতিবেশী বা স্বজনদের পাওয়া যেত, এখন মানুষ একা হয়ে পড়ছে এবং আন্তরিকতা কমে গেছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা: সিরাজগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাজরান রউফ জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ সাময়িক সংকটকে স্থায়ী ভেবে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেয়। সঠিক সময়ে পাশে কেউ থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। জেলা পুলিশ বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা, মতবিনিময় ও কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংকট নিরসনে সুপারিশ: বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল বিষয়টিকে একুশ শতকের অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে স্কুল-কলেজে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং সামাজিক সংকোচ কাটিয়ে ওঠার জোর দাবি জানিয়েছেন।
পিডিএস/এমএইউ









































