এস কে বাপ্পি, ডুমুরিয়া (খুলনা)
দখলদারদের বাধায় আটকে আছে নদী খনন, ডুববে ডুমুরিয়া

বর্ষা মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে এসে জলাবদ্ধতা নিরসনের অন্যতম প্রধান প্রকল্প শৈলমারী নদী পুনঃখনন কার্যক্রম অবৈধ দখলদারদের বাধায় আটকে গেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে এই পুনঃখনন কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে খননকৃত পলি ফেলার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ না হওয়ায় মূল নদীর ড্রেজিং কাজও শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা এবং খুলনা মহানগরের একটি অংশের লাখো মানুষের জলাবদ্ধতা নিরসনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও আশা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সরকারি প্রকল্প ও দখলদারদের বাধা: পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, রামদিয়া ১০ ভেন্ট রেগুলেটর থেকে বটিয়াঘাটা সেতুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের কাজ চলতি মাসের শুরুতে শুরু হয়। ১ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে যশোর যান্ত্রিক পানি উন্নয়ন উপ-বিভাগ। কিন্তু কাজ শুরু হতেই নদীর তীর ও সীমানা দখল করে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাধার মুখে পড়ে প্রকল্পটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর পলি জমে নদী ভরাট হওয়ার সুযোগে একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি নদীর জমি নিজেদের দখলে নিয়ে স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। এখন সরকারি খনন কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সেই অবৈধ দখল উচ্ছেদের আশঙ্কায় তারা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে জনস্বার্থের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কার্যত গুটিকয়েক দখলদারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
পলি জমে নাব্যতা সংকট ও জলাবদ্ধতা: পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, কাজীবাছা থেকে শরাফপুর পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার শৈলমারী নদী গত পাঁচ বছরে ব্যাপক পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে। এর ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে বিলডাকাতিয়া অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়াও ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা ও খুলনা সিটি করপোরেশনের একাংশে নিয়মিত কৃত্রিম জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
এদিকে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে শৈলমারী ১০ ভেন্ট রেগুলেটরের ডাইভারশন চ্যানেলসহ নদীর আরও প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে খননকাজ চলমান থাকলেও মূল নদী ড্রেজিং এখনো শুরু করা যায়নি। এর মূল কারণ খননকৃত বিপুল পরিমাণ পলি কোথায় ফেলা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির বক্তব্য: পাউবোর খুলনা যান্ত্রিক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) আব্দুল হাই শেখ বলেন, “রামদিয়া রেগুলেটর থেকে বটিয়াঘাটা ব্রিজমুখী অংশে খনন শুরুতেই বাধার মুখে পড়ে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর উপজেলা প্রশাসন নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এরপরও হোগলবুনিয়ার এক ব্যক্তি পুনরায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তাকে বটিয়াঘাটা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।”
খুলনা ড্রেজার অপারেশন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈকত বিশ্বাস বলেন, “পলি ফেলার স্থান এখনো নির্ধারণ না হওয়ায় মূল নদীর ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি সমাধানের জন্য উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সব জটিলতা কেটে গেলে আগামী সপ্তাহে ড্রেজার এসে কাজ শুরু করতে পারে।”
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, “নদীর জমি অবৈধভাবে দখল করে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করতে এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর নদী খননের জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান এ বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “নদী খননে কোনো ধরনের বাধা গ্রহণ করা হবে না। সরকার নদী পুনঃখননে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে নদী খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা বর্তমানের অন্যতম অগ্রাধিকার। সুতরাং এ কাজে কোনো ধরনের বাধা বরদাস্ত করা হবে না। পুরো বিষয়টি তদারকির জন্য বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও প্লাবনের আশঙ্কা: স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, বর্ষার শুরুতেই যখন শৈলমারী নদী খননের অতি জরুরি প্রয়োজন ছিল, তখন কেন আগে থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ ও পলি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সমাধান করা হয়নি। তাদের ভয়, প্রশাসনিক ধীরগতি ও দখলদারদের প্রভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও বিলম্বিত হলে সামনের দিনগুলোতে ভারী বর্ষণে আবারও তলিয়ে যেতে পারে পুরো এলাকা।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে ডুমুরিয়ার রংপুর ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হলেও আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আরও ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শৈলমারী নদীর খননকাজ দ্রুত সম্পন্ন না হলে সামনের দিনগুলোতে বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
পিডিএস/এমএইউ









































