সুফি জামাল উদ্দিন

  ১০ জুলাই, ২০২৬

মুসলমানের ভ্রাতৃত্ব থাকুক অটুট

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে বিভিন্ন সময় নানা ফিকহি, আকিদাগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এসব মতভেদ কখনো গবেষণা ও ইজতিহাদের ফল, আবার কখনো ইতিহাসের জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। কিন্তু মতভেদ থাকলেই তা বিদ্বেষ, অপমান, তাকফির (কাউকে কাফির ঘোষণা) কিংবা সংঘাতের কারণ হতে পারে না। কোরআন ও সুন্নাহ মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও ঐক্য রক্ষার শিক্ষা দিয়েছে।

আজ যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও ইসলামবিদ্বেষের মতো নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন কোরআনের ঐক্যের আহ্বান এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন।

মুসলমানদের প্রথম পরিচয় ‘পরস্পরের ভাই’

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই। তাই তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১০)

এই আয়াত মুসলিম সমাজে পারস্পরিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি নির্ধারণ করে। মতভেদ দেখা দিলেও তা শত্রুতা বা বিভক্তির কারণ হওয়া উচিত নয়।

বিভক্ত না হওয়ার নির্দেশ : আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো

এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে

ইমরান : আয়াত ১০৩)

তাফসিরবিদদের মতে, এখানে ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে কোরআন, ইসলামের বিধান এবং মুসলিমদের ঐক্যকে বোঝানো হয়েছে।

মতভেদ থাকবে, কিন্তু শ্রদ্ধাবোধও থাকতে হবে

ইসলাম মতভেদকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মধ্যেও বহু ফিকহি বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু সেই মতভেদ কখনো একে অপরকে হেয় করা, অপমান করা বা শত্রুতায় জড়ানোর কারণ হয়নি। বরং তাঁরা মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সৌজন্য ও উত্তম আচরণ বজায় রেখেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্যকোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম। ... তোমরা একে অপরকে নিন্দা করো না এবং মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, তাকে অপদস্ত করবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

এই শিক্ষা প্রমাণ করে, মতপার্থক্য থাকলেও একজন মুসলমানের সঙ্গে আরেকজন মুসলমানের সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌজন্য ও উত্তম চরিত্র। মতের ভিন্নতা কখনোই অপমান, বিদ্বেষ বা শত্রুতার কারণ হতে পারে না।

তাকফিরের প্রবণতা থেকে সতর্কতা

বর্তমান সময়ে মতভেদের কারণে একে অপরকে সহজেই ‘কাফির’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেউ তার ভাইকে কাফির বললে, তাদের দু’জনের একজনের উপর তা বর্তাবে।’ (সহিহ

বুখারি: ৬১০৪)

আলেমরা বলেন, যথাযথ শরয়ি দলিল ও যোগ্যতা ছাড়া কাউকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেওয়া অত্যন্ত

গুরুতর বিষয়।

গালি ও অপমানের সংস্কৃতি ইসলামের শিক্ষা নয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে যুদ্ধ করা কুফরি।’ (সহিহ বুখারি: ৪৮) আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, তাকে অপদস্ত করবে না এবং হেয় প্রতিপন্ন করবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

এসব হাদিস মুসলিমদের পারস্পরিক আচরণের নৈতিক ভিত্তি নির্ধারণ করে।

চার ইমামের শিক্ষা : ইসলামের ইতিহাসে চার মাজহাবের ইমাম- ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) বহু ফিকহি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন, কিন্তু এসব মতভেদ কখনো শত্রুতা বা বিদ্বেষে রূপ নেয়নি। বরং তাঁরা একে অপরের ইলম, তাকওয়া ও মর্যাদাকে সম্মান করতেন। তাঁদের মতভেদ ছিল কোরআন-সুন্নাহ থেকে দলিলভিত্তিক ইজতিহাদের ফল। এ থেকেই শিক্ষা পাওয়া যায়- দলিলনির্ভর মতভেদ ইসলামের জ্ঞানচর্চার অংশ হতে পারে; কিন্তু তা বিভেদ, বিদ্বেষ বা পারস্পরিক অপমানের কারণ হওয়া

উচিত নয়।

হজ: মুসলিম ঐক্যের জীবন্ত প্রতীক : প্রতি বছর হজে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির লাখো মুসলমান একই ইহরাম পরিধান করে, একই কাবাকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করেন এবং একই আরাফাতের ময়দানে মহান আল্লাহর কাছে হাত তোলেন। বর্ণ, ভাষা, দেশ কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য সেখানে গুরুত্ব পায় না; সবাই একজন রবের বান্দা হিসেবে সমবেত হন। হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক।

যে বিষয়গুলোতে মুসলমানদের অভিন্ন বিশ্বাস : মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকলেও ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলো অভিন্ন। যেমন- আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, মুহাম্মাদ (স.) আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল, পবিত্র কোরআন আল্লাহর অবিকৃত কিতাব, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, মুসলমানদের কিবলা এক- পবিত্র কাবা। এসব মৌলিক বিশ্বাস মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ভিত্তি।

বিবাদ শক্তিকে দুর্বল করে : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। আর ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনফাল : আয়াত ৪৬)

এই আয়াত শুধু ধর্মীয় নয়; মুসলিম সমাজের সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনে ঐক্যের গুরুত্বও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

মতভেদ রহমত হতে পারে, যদি তা বিদ্বেষ না হয় : আলেমরা উল্লেখ করেন, দলিলভিত্তিক ইজতিহাদি মতভেদ (ইখতিলাফ) ইসলামের জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উম্মাহর জন্য সহজতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু যখন সেই মতভেদ অহংকার, দলীয় পক্ষপাত (আসাবিয়্যাহ), বিদ্বেষ বা পরস্পরকে হেয় করার মানসিকতায় রূপ নেয়, তখন তা মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই মতভেদকে শিষ্টাচার, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ইসলামের শিক্ষা।

আমাদের করণীয় : মতভেদ ইসলামের ইতিহাসের একটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই মতভেদ যেন অপমান, বিদ্বেষ, সহিংসতা বা বিভক্তির কারণ না হয়। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর অনুসরণ করা, নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা এবং মতভেদপূর্ণ বিষয়ে শালীনতা, ন্যায়বিচার ও সংযম

বজায় রাখা।

আজ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো- দলবাজি নয়, সত্যের অনুসরণ; বিদ্বেষ নয়, ন্যায়বিচার; বিভক্তি নয়, ভ্রাতৃত্ব। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন কখনো মুসলিম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে না উঠে।

সংক্ষেপে, ইসলামের শিক্ষা হলো- মতভেদ থাকলেও কোরআনের নির্দেশিত ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সম্মান অটুট রাখা। কিবলা এক, রব এক, কিতাব এক- এই মৌলিক সত্যই মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক : আলেম ও শিক্ষক।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়