আবিদ আলী
মরক্কোর ইসলামি ঐতিহ্য মুগ্ধতা ছড়ায়

মরক্কোর ১২টি ইসলামি ঐতিহ্য, যা জানলে আপনিও মুগ্ধ হবেন : উত্তর আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মরক্কো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য দেশ। মরুভূমি, পাহাড় আর আটলান্টিক উপকূল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এর বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূগোল। ইসলামের সমৃদ্ধ ইতিহাস, জ্ঞানচর্চা, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির জন্য মরক্কো বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে ইসলাম এই দেশের সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে গড়ে উঠেছে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বখ্যাত মসজিদ। টিকে আছে সুফি ঐতিহ্য ও ইসলামি শিল্পকলার অসাধারণ নিদর্শন। সব মিলিয়ে মরক্কো মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। জেনে নিন মরক্কোর ১২টি ইসলামি ঐতিহ্য।
প্রায় পুরো দেশই মুসলিম : মরক্কোর ৯৯ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইসলাম দেশটির রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃত। মরক্কোর সমাজজীবন ইসলামের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পারিবারিক রীতি, সামাজিক আচরণ ও সাংস্কৃতিক চর্চায় ইসলামের উপস্থিতি স্পষ্ট। দৈনন্দিন জীবনের অনেক দিকেই ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য একসঙ্গে প্রবাহিত হয়। ফলে মরক্কোর জাতীয় পরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।
২. মালিকি মাজহাবের অন্যতম কেন্দ্র : মরক্কো ঐতিহাসিকভাবে ইমাম মালিক (রহ.)-এর মালিকি ফিকহ অনুসরণ করে আসছে। এটি শুধুই একটি ফিকহি মতবাদ নয়; দেশটির আইন, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক জীবনের একটি মৌলিক ভিত্তি। মরক্কোর ধর্মীয় কাঠামো মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে- মালিকি ফিকহ, আশআরি আকিদা এবং সুন্নি সুফি ঐতিহ্য। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এই ধর্মীয় ধারার তত্ত্বাবধান ও প্রতিনিধিত্বের একটি প্রতীকী অবস্থান রয়েছে রাজতন্ত্রের হাতে। দেশের বাদশাহ সাংবিধানিকভাবে ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধি ধারণ করেন, যা ধর্মীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ঐতিহ্যগত সংযোগকে নির্দেশ করে। উত্তর আফ্রিকায় সুন্নি ইসলামের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে মরক্কোর ভূমিকা তাই ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাজারো মসজিদ ও হাসান দ্বিতীয় মসজিদের গৌরব : মরক্কোতে ৪১ হাজারেরও বেশি মসজিদ রয়েছে, যার মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি জামে মসজিদ। ক্যাসাব্ল্যাঙ্কার হাসান দ্বিতীয় মসজিদ আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা ইসলামি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর ২১০ মিটার উঁচু মিনার বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম মসজিদ মিনারের একটি। মিনারের শীর্ষে স্থাপিত লেজার রশ্মি কিবলার দিক নির্দেশ করে, অর্থাৎ পবিত্র কাবা-এর দিকে আলোকরেখা পাঠায়। ইসলামি নকশা ও আধুনিক প্রকৌশলের সমন্বয়ে নির্মিত এই মসজিদ মরক্কোর স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক।
বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা : ফেস শহরে ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ইসলামি আইন, হাদিস, তাফসির, দর্শন, ভাষা ও বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
একজন মুসলিম নারীর অনন্য অবদান : আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফাতিমা আল-ফিহরি। নবম শতাব্দীতে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও দানশীলতায় গড়ে ওঠে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একজন মুসলিম নারীর হাত ধরে এমন একটি জ্ঞানকেন্দ্রের জন্ম ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠা : মরক্কো ও বৃহত্তর মাগরেব অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সহজ ছিল না। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, শক্তিশালী স্থানীয় প্রতিরোধ এবং দীর্ঘ অভিযানের কারণে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি শাসন সুদৃঢ় হতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বার্বার জনগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহণ করে এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।
স্পেন বিজয়ের ভিত্তি গড়ে দেয় মরক্কো : উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি ভিত্তি সুসংহত হওয়ার পর মরক্কোর বার্বার মুসলিম যোদ্ধাদের নেতৃত্বেই ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারেক ইবনে জিয়াদের ঐতিহাসিক আন্দালুস বিজয় সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে ইউরোপে ইসলামি সভ্যতার এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
বিশ্বখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার জন্মভূমি : বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক ইবনে বতুতা মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আর-রিহলাহ আজও ইতিহাস, ভূগোল ও সমাজ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইসলামি শিল্পকলা ও সুফি ঐতিহ্যের অনন্য কেন্দ্র : মরক্কোর মসজিদ, মাদরাসা ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে জেলিজ নামে পরিচিত রঙিন জ্যামিতিক টাইলসের শিল্পশৈলী বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। একই সঙ্গে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে সুফি সাধক, খানকাহ ও আধ্যাত্মিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা মরক্কোর ইসলামি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
ইসলামি নগর-সভ্যতার জীবন্ত নিদর্শন : ফেস এল-বালি বিশ্বের অন্যতম সংরক্ষিত মধ্যযুগীয় ইসলামি নগর। এর সরু অলিগলি, ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদরাসা, বাজার ও কারুশিল্পের কেন্দ্রগুলো শতাব্দীপ্রাচীন ইসলামি নগর পরিকল্পনা ও জীবনধারার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।
মারিনিদ যুগের স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য : মারিনিদ শাসনামলে নির্মিত বু ইনানিয়া মাদ্রাসাসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা আজও মরক্কোর ইসলামি স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। সূক্ষ্ম কাঠখোদাই, জেলিজ টাইলস, ক্যালিগ্রাফি এবং খিলানভিত্তিক নকশা এসব স্থাপনাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।
রমজানের আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য : রমজান মাসে মরক্কোর জনজীবনে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়। ঐতিহ্যবাহী ‘হারিরা’ স্যুপ দিয়ে ইফতার করা দেশটির দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির অংশ। অন্যদিকে রাজধানী রাবাতে আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। ইউনেসকো ২০২৬ সালের জন্য রাবাতকে ‘বিশ্ব বই রাজধানী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
মরক্কো ইসলামি ইতিহাস, জ্ঞানচর্চা, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। দেশটি আজও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ মরক্কো।
তথ্যসূত্র: নিউ আরব, আইইউএমএস, ইউনেসকো, আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গবেষণা, মরক্কোর ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন একাডেমিক সূত্র এবং প্রদত্ত তথ্যসমূহ
"









































