হাফেজ মাওলানা আজিজুল হক

  ২৬ জুন, ২০২৬

আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। এটি বিশ্বের সকল মুসলমানের জন্য অপরিসীম আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

আশুরার ঐতিহাসিক ধর্মীয় গুরুত্ব ও আমল : ঐতিহাসিক মুক্তি ও রহমত: এই দিনে আল্লাহ তাআলা ফেরাউনের জুলুম থেকে হজরত মুসা (আ.) এবং বনি ইসরাইলকে লোহিত সাগর পার করে মুক্তি দিয়েছিলেন। এছাড়া হজরত নুহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবনের পর জুদি পর্বতে নিরাপদে নোঙর করেছিল।

রোজা ও ইবাদতের ফজিলত: রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা বাধ্যতামূলক বা ফরজ ছিল। বর্তমানে এটি নফল ইবাদত হিসেবে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনে রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখতে উৎসাহিত করতেন।

আশুরার রোজা রাখা: আশুরার দিনের মূল ইবাদত হচ্ছে এ দিনের রোজা রাখা। শরিয়তের দৃষ্টিতে আশুরার রোজা রাখা নফল। আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, আশুরার এক দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে এই আশা করি যে তিনি এ রোজার অসিলায় বান্দার আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)। তবে তিনি আশুরার আগে বা পরে অন্তত আরো একটি রোজা রাখতে বলেছেন যাতে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়।

বিধর্মীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করা: মহররমের দশম দিবসে ইহুদিরা রোজা রাখত। এজন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং তাতে ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণ করো। আশুরার আগে এক দিন বা পরে এক দিন রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১৫৪)। এ ছাড়া এ মাসের শুরুর দিনটিকে তারা ঈদের মতো উদযাপন করত। রাসুল (সা.) তাদের সঙ্গে উদযাপন করতে নিষেধ করেছেন এবং মুসলিমদের দুটি ঈদ—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, কিয়ামতের দিন সে ওই জাতির দলভুক্ত হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)।

তওবা-ইস্তিগফার করা : এটি যেকোনো সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আশুরার সাথে তাওবা কবুল হওয়া, আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি, নিরাপত্তা এবং গায়েবি মদদ লাভ করার ইতিহাস জুড়ে আছে। এজন্য এ সময়ে বিশেষভাবে তাওবা- ইস্তেগফার করা উচিত। রাসুলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, তুমি যদি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও তাহলে মহররমের রোজা রাখো। কেননা মহররম হচ্ছে আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একদিন আছে, যেদিন আল্লাহ তায়ালা অতীতে অনেকের তাওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও অনেকের তাওবা কবুল করবেন ( জামে তিরমিজি, হাদিস : ৭৪১)।

পরিবারের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা : রাসুলুল্লাহ ( সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি করবে, ভালো খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সারা বছরের প্রাচুর্য বাড়িয়ে দিবেন। হজরত সুফিয়ান ছাওরি ( রহ:) বলেন, আমরা এটি পরিক্ষা করেছি এবং এর যথার্থতা পেয়েছি ( ফয়জুল কালাম, হাদিস : ৫০১)।

আশুরার ঐতিহাসিক ভিত্তি : আশুরার দিনে কতগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পৃক্ত। ১. আল্লাহ্তায়ালা আকাশ-জমিন-পাহাড়-পর্বতসহ সব পৃথিবী এ দিনে সৃষ্টি করেন। ২. আদি মানব হজরত আদম (আ.) এই দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন, এই দিনই তার তওবা কবুল করা হয় এবং এ দিনে তিনি স্ত্রী হাওয়া (আ.)-এর সঙ্গে আরাফার ময়দানে সাক্ষাৎ লাভ করেন। ৩. হজরত ইউনুছ (আ.) এই দিনে ৪০ দিন পর মাছের পেট থেকে আল্লাহ্র রহমতে মুক্তি লাভ করেন। ৪. এই দিনই হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পেয়ে তুরস্কের জুদি নামক পর্বতে নোঙর করে। ৫. হজরত ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের প্রজ্বালিত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ৪০ দিন পর সেখান থেকে ১০ মহররম মুক্তি লাভ করেন। ৬. দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগের পর হজরত আইয়ুব (আ.) দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ করেন। ৭. হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.) তার ১১ ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে কূপে পতিত হন এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর ১০ মহররম তারিখে পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন। ৮. হজরত মুসা (আ.) এই দিনে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি লাভ করেন এবং অভিশপ্ত ফেরাউনকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। ৯. এই দিনে হজরত ইসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং তার জাতির লোকরা তাকে হত্যাচেষ্টা করলে আল্লাহপাক তাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়ে মুক্তিদান করেন। ১০. কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবার-পরিজনসহ শাহাদতবরণ করেন। এ ছাড়া হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে, মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।

আশুরার রোজা পালনের সুন্নাহ পদ্ধতি : আশুরা আরবি শব্দ। আশুরা অর্থ দশম। মুহাররম মাসের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। পবিত্র রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এই আশুরার রোজা ফরজ ছিলো। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

আশুরার রোজা পালনের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) উম্মতকে একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতির শিক্ষা দিয়েছেন। মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার লক্ষ্যে নবীজি (সা.) আশুরার সঙ্গে আরও একটি দিন রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)

এ হাদিসের আলোকে ফকিহরা মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ একসঙ্গে রোজা রাখাকে উত্তম বলেছেন। একইভাবে ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখাও বৈধ ও প্রশংসনীয়। আর কেউ যদি ৯, ১০ ও ১১- এই তিন দিন রোজা রাখে, তবে তা আরও উত্তম।

এতে আশুরার রোজা নিশ্চিতভাবে আদায় হয়, ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্যও পরিহার করা যায় এবং সুন্নাহের পূর্ণ অনুসরণ করা সম্ভব হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি ফি শারহি সহিহিল বুখারি, ৬/৫৩৩, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দামেস্ক, ২০১৩)

আশুরার রোজার ফজিলত : আশুরা আরবি শব্দ। আশুরা অর্থ দশম। মুহাররম মাসের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। পবিত্র রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এই আশুরার রোজা ফরজ ছিলো। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

আশুরার রোজার সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তবে এর জন্য কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।

নবীজিকে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

আশুরার রোজার বিধান : ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হতো। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হয়, তখন আশুরার রোজা নফল হিসেবে গণ্য হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি ফি শরহি সহিহিল বুখারি, ৬/২৫২-২৫৩, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দামেস্ক, ২০১৩)

আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘কোরাইশরা জাহেলি যুগেও আশুরার রোজা পালন করত। নবীজিও তা পালন করতেন। অতঃপর মদিনায় এসে তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দিলেন। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০২)

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ও আত্মত্যাগ : ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে (১০ মহররম) কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। এই আত্মত্যাগ অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত না করার চিরন্তন শিক্ষা প্রদান করে। হজরত হুসাইন (রা.) আশুরার দিনে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে অসত্য, অসুন্দর, অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের জন্য আত্মোৎসর্গ করে অনন্তকালের জন্য আদর্শিক শিক্ষা এবং শক্তির ওপর সত্যের বিজয়ের চেতনা জাগরত করে গেছেন।

বর্জনীয় আমল : আলোকসজ্জা প্রদর্শন, তাজিয়া বানানো, শোক পালন করা, মাতাম করে বুক চাপড়ানো, পিঠে চাবুক দিয়ে আঘাত করা, শরীর রক্তাক্ত করা, শোক মিছিল বের করা, মর্সিয়া বা শোকগাঁথা পাঠ করা, আতশবাজি ফোটানো, বিশেষ খাবার বা শরবত বানিয়ে বিতরণ করা ইত্যাদি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়