reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ৩০ জুন, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি

কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অনিশ্চয়তা, স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে সংশয়

কাতারের রাজধানী দোহায় আসা শীর্ষ মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসবেন না বলে জানিয়েছেন কাতারের একজন কর্মকর্তা। ফলে ইরান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বৈশ্বিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত বিষয়ে কেবল কারিগরি (টেকনিক্যাল) আলোচনা হবে। পরবর্তীতে এই আলোচনাকে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হতে পারে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দোহায় কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানসংক্রান্ত আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছে উপসাগরীয় দেশটি।

এদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দোহায় পৌঁছান।

তবে ইরান জানিয়েছে, একটি প্রতিনিধিদল দোহায় গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা হবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচনার দাবিও নাকচ করেছে তেহরান।

কাতারও জানিয়েছে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে দোহায় কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বা সরাসরি আলোচনার পরিকল্পনা নেই। এর আগে গত সপ্তাহান্তে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে, যা গত ১৭ জুনের যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

১৪ দফার ওই অন্তর্বর্তী চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকে উভয় পক্ষকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো, এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচিসহ অন্যান্য জটিল ইস্যুগুলো সমাধানের জন্য ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে এবং যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বড় অংশই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।

কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়ন এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের সঙ্গে বুধবার দোহায় আলোচনা হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "আগামী দিনগুলোতে মার্কিন পক্ষের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই আমাদের বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারিত নেই।"

অথচ এর আগে সোমবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, কুশনার ও উইটকফ দোহায় 'উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে' অংশ নেবেন এবং এর পাশাপাশি মূল আলোচনার বাইরে কারিগরি আলোচনা চলবে। তবে এই কারিগরি আলোচনার সুনির্দিষ্ট সময় এখনো স্পষ্ট নয়।

কাতারি মুখপাত্র আনসারি বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—আমাদের সামনে বেশ কয়েকটি আলোচনার পথ (ট্র্যাক) রয়েছে।

এদিকে স্থায়ীভাবে যুদ্ধাবসানের কূটনৈতিক এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও, গত রোববারের পর যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর তেলের বাজারে এটাই সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক দরপতন হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা: চার মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। অথচ বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। এর পর থেকে ইরান ওমানকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তেহরান জানিয়েছে, তারা এই জলপথ ব্যবহারের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায় করার পরিকল্পনা করছে। একারণে ইরানের নির্ধারিত রুটের বাইরে জাহাজগুলোর চলাচলে বাধা দিচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন দিয়ে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত করেছে। এর জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে গত রোববার কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। বর্তমানে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।

এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার হোয়াইট হাউস জানায়, ট্রাম্প মরক্কো থেকে ফসফেট সার আমদানির ওপর কিছু শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত করার অনুমোদন দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে সারের চালান ধীরগতিতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার আশঙ্কার মাঝেই মার্কিন কৃষকেরা তীব্র সার সংকটের মুখোমুখি হওয়ায় এই জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, "দোহার বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। আমরা শিগগিরই তা জানতে পারব।"

এদিকে ইরানের নেতৃত্ব যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিলেও—ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে অসন্তোষ রয়েছে দেশটিতে। এর মাঝেই দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলায় রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে, লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধের বিধানও যুক্ত রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহর মিত্র ও লেবাননের প্রভাবশালী পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার পৃথক একটি রূপরেখা চুক্তি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের শর্তযুক্ত করার ফলে, এই চুক্তি আদতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থাকেই উসকে দেওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়