মাওলানা হাশমতুল্লাহ

  ০৫ জুন, ২০২৬

মায়ের পদতলে জান্নাত

ইসলাম মাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। তার মর্যাদাকে মহিমান্বিত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার শোকরিয়া ও তোমার মা-বাবার শোকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৪)

সন্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে মা-ই বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন। গর্ভধারণ, দুগ্ধপান ও রাত জেগে সন্তানের তত্ত্বাবধানসহ বিভিন্ন কষ্ট একমাত্র মা-ই সহ্য করেন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আমি মানুষকে মা-বাবার সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুগ্ধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌঁছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন বলে- হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার ও আমার মা-বাবার ওপর যে নেয়ামত দান করেছো, তার যেনো কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি। আমি যেনো ভালো কাজ করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করো। আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে

সংশোধন করে দাও। নিশ্চয়ই আমি

তোমার কাছে তওবা করলাম। আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত : ১৫)

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘মা-বাবাই হলো তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২১)

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের নজরে দেখে, আল্লাহতায়ালা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ৪২১)

মা হিসেবে ইসলামে একজন নারীর অবস্থান অকল্পনীয়। ইসলামে বাবার চেয়ে মায়ের মর্যাদা তিনগুণ বেশি। পবিত্র কোরআনে মায়ের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করে মাকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তার সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না এবং পিতামাতার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৬)

একবার এক লোক এসে রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার থেকে সদাচরণ পাওয়ার সর্বাধিক অধিকার কার?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মায়ের।’ সে আবারও একই প্রশ্ন করলো। তিনি দ্বিতীয়বারও উত্তরে বললেন, ‘তোমার মায়ের।’ সে আবারও একই প্রশ্ন করলে তিনি তৃতীয়বারের উত্তরেও বললেন, ‘তোমার মায়ের।’ সে আবারও একই প্রশ্ন করলে রাসুল (সা.) চতুর্থবার বললেন, ‘তোমার পিতার।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬২৬)

সন্তানদের শিক্ষিত বানানোর আগে মানুষ বানানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।

মঙ্গলবার (২ জুন) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে এই আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

গত রোববার (৩১ মে) রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে সাত দিনের বেশি সময় ধরে পচে-গলে পড়ে থাকা ৭২ বছর বয়সি নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। যার তিন ছেলের একজন যুগ্ম-সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, আরেকজন কানাডা প্রবাসী।

উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত তিন সন্তান থাকতে একজন মায়ের শেষ পরিণতি কেন এতটা নিষ্ঠুর হলো, নিজের পোস্টে সেদিকেই আলোকপাত করেছেন আহমাদুল্লাহ।

বৃদ্ধার এলোমেলো কক্ষের ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘সাত-আট দিন আগে ময়লার ভাগাড়ের মতো এই ঘরে মরে পচে গেছেন এমন এক বৃদ্ধা, যার এক ছেলে বুয়েট-শিক্ষক, আরেক ছেলে যুগ্ম-সচিব, অন্য ছেলে কানাডা-প্রবাসী।’

আহমাদুল্লাহ লিখেছেন, ‘এদেশের অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানকে কথিত সফলতার যে স্বপ্নচূড়ায় দেখতে চান, বৃদ্ধার তিন ছেলেই জাগতিক সাফল্যের সেই স্বর্ণচূড়া স্পর্শ করেছে। কিন্তু মাঝখানে একটা ঈদ গেল, মা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে থাকা সন্তানদের খোঁজ নেওয়ার হয়তো সুযোগটুকুও ঘটেনি। একাকী ঘরের মধ্যে মরে শরীরের মাংস খসে খসে পড়েছে বৃদ্ধার।’

জনপ্রিয় এই ইসলামি স্কলার লিখেছেন, ‘যে সফলতা বাবা-মার ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়, যে সফলতা মৃত্যুর সময়ও এক আঁজলা পানি নিয়ে মায়ের মাথার কাছে বসার ফুরসত দেয় না, আমাদের প্রয়োজন নেই এমন সফলতার।’

দীন, মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং মানুষ হওয়ার শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যতদিন আমরা শুধু বস্তুবাদ ও বৈষয়িক সফলতার পেছনে ছুটব, ততদিন এই ধরনের অনাকক্সিক্ষত ঘটনা আমাদের দেখে যেতে হবে।

আসুন, শিক্ষিত হওয়ার আগে মানুষ হই। সন্তানকে শিক্ষিত বানানোর আগে মানুষ বানাই। সন্তানকে বিদেশে পাঠানো এখন সামাজিক মর্যাদা এবং অন্যের কাছে গল্প করার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ সন্তান দূরে থাকা প্রত্যেক বাবা-মার জন্যই সীমাহীন কষ্টের বিষয়।

‘তারপরও বস্তুবাদ ও বৈষয়িক মর্যাদার হাতছানিতে অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানকে বিদেশে পাঠাতে মরিয়া। যার ফলাফল, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন।’ ‘অথচ আমরা যদি অল্পে তুষ্ট থাকি, সন্তানকে গর্ব ও মর্যাদার কন্টেন্ট না বানিয়ে নিজের কাছে আগলে রাখি, তবে পরিবারবেষ্টিত আমাদের বার্ধক্যও হবে আনন্দময়।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়