মাওলানা মাসউদুল কাদির
ত্যাগের মহিমাগাথা ঈদুল আজহা

পৃথিবীর শুরু থেকেই কোরবানি প্রচলিত। ত্যাগের মহিমাগাঁথা ঈদুল আজহা বারবারই ফিরে আসে। সব সময়। ঈদ অর্থও তা-ই। বারবার ফিরে আসে বলেই ‘ঈদ’কে আমরা ঈদ বলি। নিজের পশুত্বকে ত্যাগ করাই কোরবানির আসল মাহাত্ম্য। নিজের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি প্রকাশের একটি মাধ্যম। এতে যেমন হতদরিদ্র মানুষের অধিকার রয়েছে, তেমনি আছে আত্মার পবিত্রতা।
আমরা জানি, পৃথিবী শুরু হয়েছে হজরত আদম (আ.) থেকে। তার ছেলেদের দিয়েই মহান আল্লাহ কোরবানির মতো একটি অনন্য আমলের সূত্রপাত করেন। পৃথিবীতে আগত সব মানুষের জন্য রেখে গেছেন নীতি ও নৈতিকতার এক বিরল ইতিহাসও। হজরত আদমের দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল ছিলেন কোরবানির উদ্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দ্র ছিল আজকের সমাজে পণ্য হয়ে ওঠা নারী। একজন সুন্দরী নারীর সংস্পর্শ পাওয়ার আগ্রহেই দুজন সন্তান বিবাদে জড়িয়ে যান। তখন হজরত আদমের এক জোড়া সন্তানের (ছেলে ও মেয়ে) সঙ্গে অপর জোড়া সন্তানের (ছেলে ও মেয়ে) বিয়ে হতো। কাবিল এই বিধান অমান্য করলেই সমস্যা বেধে যায়। জাতির পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালাম এ বিবাদ মেটানোর নিমিত্তে তাদের উভয়কেই দুম্বা কোরবানি দেওয়ার নির্দেশ করলেন। তিনি বললেন, ‘যার কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে, তার কোরবানি আকাশ থেকে আগুন এসে জ্বালিয়ে দেবে এবং তারই বিয়ে হবে।’
মহান আল্লাহ সবসময় সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চান। পৃথিবীর সূচনাতেও সত্যকেই জিতিয়ে দিলেন মহান আল্লাহ তায়ালা। পবিত্র কোরআনে কত নির্জলা ভাষায় মহান আল্লাহ ইরশাদ করছেন, ‘আদমের দুই ছেলের বৃত্তান্ত তুমি তাদের শোনাও। তখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো, অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। সে বললো, আমি তোমাকে হত্যা করবোই, অন্যজন বললো, অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।’ (সুরা মায়িদা : আয়াত : ২৭)
দায়িরাতুল মারিফের এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, হজরত নুহ (আ.) জন্তু জবাই দেওয়ার জন্য একটি কোরবানির জায়গা (কোরবানির মাঠ) তৈরি করেছিলেন। মাঠে তিনি জবাই করা পশু আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতেন।
কোরবানি উপলক্ষে হজরত ইবরাহিম (আ.) দিয়েছিলেন সবচেয়ে বড় ত্যাগ। কতটা বছর প্রভুর দরবারে চেয়ে শেষে হজরত ইসমাঈলের মতো ফুটফুটে বালক মহান আল্লাহ তাকে দান করেছিলেন। এ বালককে দিয়েই তিনি আবার একটি বড় পরীক্ষা নিলেন। ইবরাহিম (আ.) ছিলেন খলিলুল্লাহ। আল্লাহর বন্ধু। বন্ধুত্বের এত বড় পরীক্ষা দিতে হয় পৃথিবী হয়তো এর আগে জানতোই না। হজরত ইবরাহীম পরীক্ষা দিলেন, উত্তীর্ণ হলেন। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অবতীর্ণ পবিত্র কালামে মহান আল্লাহ খুব সাবলিলভাবে বর্ণনাটি করেছেন। ‘অতঃপর সে যখন তার বাবার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম (আ.) তাকে বললেন, বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি, তোমাকে জবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কি বলো। সে বললো, পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহিম (আ.) জবেহ করার জন্য শায়িত করলেন। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে, আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। (সুরা আসসাফ্ফাত : আয়াত ১০২-১০৭)
একটা কথা বলে রাখা দরকার, আমরা যেমন স্বপ্ন দেখি, তা বাস্তবও হতে পারে আবার মিথ্যাও হতে পারে। বাস্তব হওয়ার জন্য এটা কোনো দলিল নয়। তবে পৃথিবীতে যেসব নবী স্বপ্ন দেখেছেন তা সত্য। পরাবাস্তব। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই একটি বার্তা। তিনি তা বুঝতে পেরেছিলেন। সে অনুযায়ি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। মহান আল্লাহর তায়ালার সন্তুষ্টিও লাভ করেছিলেন।
কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই মহান আল্লাহর দরবারে তা পৌঁছে যায়। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কোরবানির দিন আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে (কোরবানির চেয়ে) বনি আদমের জন্য অন্য কোনো আমল বেশি পছন্দনীয় নয়। কোরবানির পশু কিয়ামতের দিন তার শিং, পশম ও হাড়সহ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে। আর কোরবানির পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা কোরবানি করে নিজেদের হৃদয়কে সন্তুষ্ট রাখো। (তিরজিমি)
কোরবানি দেওয়ার জন্য কিছু শর্তাবলি রয়েছে। ব্যক্তিকে মুসলমান হতে হবে, স্বাধীন হতে হবে, মুকিম হতে হবে ও সামর্থবান হতে হবে। সুতরাং যিনি কাফির, দাস-দাসী, মুসাফির ও দরিদ্রদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। ফাতওয়ায়ে শামির উদ্ধৃতি দিয়ে ইসলামি ফিকাহ গবেষকরা বলেছেন, কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে, নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হওয়া জরুরি নয়। দৈনন্দিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি স্বর্ণের মালিকানাকে নেসাব বলা হয়।
হজরত ইবরাহিমের আত্মত্যাগের এই জলজ্যান্ত ঘটনা মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করে জীবনে কোরবানির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে কোরবানির প্রতি মানবজাতিকে উৎসাহিত করে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। (সুরা কাউসার : আয়াত ২)
ছাগল, দুম্বা, ভেড়া, গরু, মহিষ ও উট এগুলো ছাড়া অন্য যত পশু দামেরই হোক তা দিয়ে কোরবানি হবে না। গরু, মহিষ, উটের কোনো একটি দিয়ে সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া যাবে। আর ছাগল, ভেড়া, দুম্বা দিয়ে একজনের পক্ষেই কোরবানি দেওয়া যাবে। গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দু’বছর হতে হবে, উটের বয়স হতে হবে পাঁচ বছর আর অন্য জন্তুগুলোর বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে।
ঘোড়া, অন্ধ, রুগ্ন, কৃশ ও দুর্বল জন্তু দিয়ে কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। যে প্রাণী এতই দুর্বল ও রোগা হয় যে, এটি কোরবানির স্থলভূমি পর্যন্ত নিজে হেটে পৌঁছুতে সক্ষম নয়, তা দিয়ে কোরবানি জায়েয নয়। দুররে মুখতারে আছে, যে প্রাণীর কান জন্মগতভাবে নেই তার কোরবানি বৈধ নয়।
সময়মতো কোরবানি করতে না পারলে কোরবানির পশুর সমপরিমাণ অর্থ দরিদ্রদের দান করা ওয়াজিব। তবে কোরবানির দিনগুলোতে কোনো দান-সাদকা করলে হবে না। পৃথক বৈশিষ্ট্য রাখে এই কোরবানির আমল। নামাজ যেমন রোজা দিয়ে আদায় হয় না, তেমনি কোরবানিও অন্য কোনো উপায়ে আদায় হয় না। দান এক জিনিস আর কোরবানি আরেক জিনিস। কোরবানি একটি স্বতন্ত্র আমল। স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্য রাখে এই কোরবানি।
কোরবানি একজন জান্তা ব্যক্তিকে করতে হয়। নিজে কোরবানি করার নিয়ম না জানলে তখন কোনো জান্তা ব্যক্তির সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। চামড়া ব্যবসায় সহযোগিতা হয় বলে সুন্নতি পোশাকে পাড়ার মাস্তানরাও রূপ ধারণ করে। যে কাউকে দিয়ে কোরবানি করা উচিত নয়। জবেহ করার সময় ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা জরুরি। কোরবানির পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে এই দোয়াটি পড়তে হয়- ‘ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজ্হিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিন ওয়া খালিলিকা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম।’ এই দোয়াটি একটু পেছনে সরে পড়াটা ভালো।
কোরবানির গোশত বিক্রি করা হারাম। যিনি কোরবানির পশুর অর্থ ব্যয় করবেন, তিনিই কোরবানির পশুর গোশত ও হাড়ের মালিক। সব গোশত নিজে রেখে দিতে পারেন আবার সাধারণদের মধ্যে বণ্টনও করতে পারেন। তবে কোরবানির গোশত তিনভাগ করতে হবে। এক. নিজের পরিবারের জন্য। দুই. আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব। এবং তিন. গরিব-অসহায় ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। কয়েকজন মিলে এক সঙ্গে কোরবানি দিলে অবশ্যই অনুমান করে তা ভাগ করবে না। পাল্লায় মেপে ভাগ করতে হবে। অন্যথায় কোরবানি আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
ত্যাগ ছাড়া মানুষের সফলতা নেই। নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে যে অন্যের জন্য ফেদা হবে, তবেই তো পৃথিবী নতুন করে গড়ে উঠবে। ঈদুল আজহা মূলত সে বার্তা নিয়েই আমাদের কাছে আগমন করে। ত্যাগের শিক্ষাই ঈদুল আজহা থেকে আমরা গ্রহণ করি। ত্যাগ ছাড়া মানুষের জীবন কখনোই সুন্দর হয় না। হজরত ইসমাইলকে ত্যাগ করার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে হজরত ইবরাহিম (আ.) পৃথিবীবাসীকে ত্যাগের শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। মুসলমানদের ঈমানের ঝলক রয়েছে ত্যাগে। কোরবানিতে। আত্মত্যাগের মহিমাবন্দনা বিশ্বাবাসীর হৃদয় ছুঁয়ে যাক। এ প্রত্যাশাই আমাদের।
লেখক : আহ্বায়ক
ন্যাশনাল ইকরা কারিকুলাম কাউন্সিল
"









































