জিন্নাতুন নেসা শান্তা, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নীল সমুদ্রের ডাকে

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। আমি, মীম, রাকিবা ও আঁখি ব্যাগপত্র নিয়ে হল থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পৌঁছাই। সহপাঠী, সিনিয়র-জুনিয়র আর শিক্ষকদের প্রাণচঞ্চল উপস্থিতিতে মুহূর্তেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়। বিকেল পাঁচটায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাস্ট) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুটি বাস কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
দীর্ঘ রাত পেরিয়ে সকাল সাড়ে সাতটায় পৌঁছাই কক্সবাজারে। রিসোর্টে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে ছুটে যাই সুগন্ধা সমুদ্রসৈকতে। উত্তাল ঢেউ, নোনা বাতাস আর দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি মুহূর্তেই মন ভরিয়ে দেয়। পানিতে দাপাদাপি, ছবি তোলা আর অফুরন্ত হাসি-আনন্দে কেটে যায় প্রথম প্রহর। এরই মধ্যে দেখি মৌলি ও তাসফিয়া ঘোড়ায় চড়ে সৈকত ঘুরে বেড়াচ্ছে।
রূপচাঁদা ভাজা দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ শেষে আমাদের গন্তব্য হয় দরিয়ানগর। সমুদ্রের গর্জন, শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে বেড়ানো আর বিকেলের স্নিগ্ধ আলো জায়গাটিকে আরো মোহনীয় করে তোলে। পরে শারমিন আপুর ডাকে শুরু হয় পিলো পাসিং, চকলেট ঝুলানো, সেন্সরি প্লে, লটারি ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। হাসি, উচ্ছ্বাস আর আনন্দে জমে ওঠে পুরো বিকেল। সূর্যাস্ত দেখে রিসোর্টে ফিরেই শেষ হয় প্রথম দিনের ব্যস্ততা। পরদিন সকালে বার্মিজ মার্কেট বন্ধ থাকায় শাহাদাৎদের পরামর্শে হাসিব, মিথি, আমি ও বাকিরা চলে যাই লাবনী সমুদ্রসৈকতে। পরিবারের জন্য আচার, ব্যাগ, ব্রেসলেট, মালা, দুলসহ নানা স্মারক কিনে ফিরে আসি। মৌলি সবার জন্য শুঁটকি কিনে আনে। এরপর শুরু হয় আমাদের গ্রুপভিত্তিক ফুড হাইজিন সেশনালের কাজ। একটি রেস্টুরেন্টে খাবারের অর্ডার দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করি। আনন্দের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক এই শিক্ষাও ছিল ভ্রমণের অন্যতম প্রাপ্তি।
দুপুরে সুস্বাদু কোড়াল ভুনা দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়ি বহু প্রতীক্ষিত মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণে। খোলা ছাদের চাঁদের গাড়িতে এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে পাহাড়- প্রকৃতির এমন রূপ যেন চোখে লেগে থাকার মতো। হিমছড়িতে গ্রুপ ছবি তোলার পর দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠি। পথে তনয় স্যার বললেন, “আর কয়েকটা সিঁড়ি, যাও।” চূড়ায় উঠে সমুদ্র-পাহাড়ের অপূর্ব মিলন দেখে সব ক্লান্তি নিমেষেই হারিয়ে যায়। এরপর পাটুয়ারটেকে গিয়ে স্ফটিকস্বচ্ছ জল, প্রবাল আর ঢেউয়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। আমি, মীম, রাকিবা ও আঁখি আকরামের ক্যামেরায় কিছু প্রিয় মুহূর্ত বন্দি করি। স্বচ্ছ জলে আমাদের চারজনের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে আমাদের বন্ধুত্বের গল্প নিজের বুকেই লিখে রাখছে। শেষে পুরো বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্মরণীয় একটি গ্রুপ ছবি তোলা হয়।
ফেরার পথে চাঁদের গাড়িতে সবাই মিলে গেয়ে উঠি- “এই পথ যদি না শেষ হয়...”। তখন মীম হেসে বলল, “আমাকে রেখে যাও এখানে!” সবাই হেসে উঠলেও মনে হচ্ছিল, মুহূর্তটা যেন আর শেষ না হয়। গ্রিল ও নান দিয়ে রাতের খাবার শেষে যশোরের উদ্দেশে রওনা দিই। সারারাত জারিন, তিথী, অর্পণ, অর্পিতা, তাসফিয়া এবং সিনিয়র আপু-ভাইদের গান, নাচ ও আড্ডায় মুখর ছিল পুরো বাস।
ফিরে এসেছি ক্যাম্পাসের ব্যস্ত জীবনে, কিন্তু কক্সবাজারের সেই দু’দিন আজও স্মৃতিতে অমলিন। সমুদ্রের গর্জন, নোনা বাতাস, বন্ধুদের হাসি, শিক্ষকদের সান্নিধ্য আর একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত বারবার ফিরে যেতে ডাক দেয়। এই শিক্ষা সফর শুধু একটি ভ্রমণ নয়; ছিল শেখা, বন্ধুত্ব আর আজীবন লালন করার মতো অসংখ্য স্মৃতির এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সফল আয়োজনের জন্য আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচ সিমবায়োন্ট-১৫-এর প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
"









































