মো. আশিকুজ্জামান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
ব্লাস্ট-প্রতিরোধী উচ্চফলনশীল গমের নতুন মিউট্যান্ট লাইন উদ্ভাবন

২০১৬ সালের কথা। দেশের গমচাষিরা হয়তো এখনো ভুলতে পারেননি সেই দুঃস্বপ্নের কথা। একদিন সকালে ক্ষেতে গিয়ে দেখা গেল, সবুজ-সোনালি শিষগুলো রাতারাতি সাদা হয়ে গেছে। প্রথমে কেউ বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে। পরে জানা গেল, এশিয়ার মাটিতে এই প্রথম হানা দিয়েছে গমের ব্লাস্ট রোগ- এটি এমন এক রোগ, যা আগে শুধু দক্ষিণ আমেরিকাতেই দেখা যেত। প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির গম নষ্ট হয়ে যায় সেবার, কোথাও কোথাও ফলন-ক্ষতি একেবারে শতভাগ। কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ!
এই ঘটনার পর থেকেই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম। তিনি ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। রোগটা কীভাবে ছড়াচ্ছে, কেন এত ভয়ংকর, এসব নিয়ে গবেষণা তো হলোই, কিন্তু তার মাথায় তখন অন্য একটা প্রশ্ন ঘুরছিল- শুধু রোগ চিহ্নিত করে লাভ কী, যদি এমন একটা জাত তৈরি করা না যায় যেটা এই রোগেই কাবু হবে না?
এই লক্ষ্য নিয়েই শুরু হয় একটা দীর্ঘ প্রকল্প। ভিয়েনার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থায়নে কাজ শুরু করেন তিনি, সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের পিএইচডি ফেলো ড. হোসেন সোহরাওয়ার্দী। পদ্ধতি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মিউটেশন ব্রিডিং, অর্থাৎ গামা রশ্মি ও এক্স-রে দিয়ে বীজের জিনগত পরিবর্তন ঘটানো। শুধু তা-ই নয়, চীনের বেইজিংয়ের ইনস্টিটিউট অব ক্রপ সায়েন্সের সঙ্গে যৌথভাবে লানঝৌ-এর ল্যাবে গমের বীজে প্রয়োগ করা হয় উচ্চ-শক্তির কার্বন আয়ন বিম। বাংলাদেশে গম নিয়ে এই ধরনের তিন রকম পারমাণবিক পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার আগে কখনো হয়নি।
বছরের পর বছর ল্যাবরেটরি আর মাঠ পর্যায়ের হাড়ভাঙা খাটুনির পর অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গবেষণাগার পেরিয়ে গম ব্লাস্টের সবচেয়ে বড় ‘হটস্পট’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা মেহেরপুরের মাঠে যখন এই নতুন গম উদ্ভিদের পরীক্ষা করা হলো, তখন ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীদের চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। তৈরি হলো অষ্টম প্রজন্মের (গথ৮) এমন কিছু সমজাতীয় মিউট্যান্ট লাইন, যা ব্লাস্ট রোগকে পাত্তাই দেয় না! এই নতুন গম শুধু যে রোগ প্রতিরোধে শতভাগ সফল তা-ই নয়, মাঠের সাধারণ এলিট জাতের তুলনায় এর ফলনও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখলেন, প্রতিটি গম উদ্ভিদে কার্যকর কুশি বা টিলারের সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই অভাবনীয় ফলন সম্ভব হচ্ছে।
এই বিষয়ে ড. তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে ব্লাস্ট-প্রতিরোধী ও উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবনে আয়ন বিম ও এক্স-রে ব্যবহার এবারই প্রথম। এই মিউট্যান্ট লাইনগুলো এখন নতুন জাত হিসেবে ছাড়করণের জন্য মাঠ পর্যায়ে আঞ্চলিক ট্রায়ালের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। এটা সফল হলে কৃষকদের ফলন বিপর্যয় ঠেকানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও অনেকটা নিশ্চিত হবে।”
কথাটা শুনতে সহজ লাগলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছরের নির্ঘুম রাত, বারবার ব্যর্থ হয়েও আবার শুরু করার গল্প। যে মাটিতে একদিন গম পুড়ে সাদা হয়ে গিয়েছিল, সেই একই মাটি থেকেই এবার জন্ম নিতে চলেছে রোগ-প্রতিরোধী, বেশি ফলনশীল নতুন এক জাত।
দেশের জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, চাষযোগ্য জমি যেভাবে কমছে, এই বাস্তবতায় এমন একটা আবিষ্কার আসলে শুধু একটা সাফল্যের খবর নয়। এটা এক ধরনের ভরসা, যে সংকট যতই বড় হোক, সমাধান খুঁজে বের করার মতো মানুষ এই দেশে এখনো আছেন। এখন অপেক্ষা শুধু একটাই- আঞ্চলিক ট্রায়াল পার হয়ে এই গম কবে সত্যিকারের দেশের সকল প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেতে পৌঁছায়, আর কবে আবার সেই মাঠগুলো ভরে ওঠে সোনালি শিষে।
"









































