রাজধানীতে বৃষ্টির হানা
জলজট, যানজট ও গণপরিবহন সংকটে নাকাল নগরবাসী

কয়েক দিনের টানা বর্ষণের পর সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেও বৃষ্টির তোড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকার জনজীবন। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকেই আকাশ ভেঙে নামা প্রবল বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন সড়কে তৈরি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। একদিকে জলজট ও দীর্ঘ যানজট, অন্যদিকে রাস্তায় গণপরিবহনের তীব্র সংকট—এই ত্রিমুখী ভোগান্তিতে পড়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নগরবাসীর এমন চরম দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।
ভোর থেকেই ভোগান্তির শুরু
গত শনিবার দিবাগত শেষরাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিতে প্রথম দফায় ডুবেছিল ঢাকার অধিকাংশ রাস্তাঘাট। গতকাল রোববার বিকেলে বৃষ্টি কমলে কিছুটা স্বস্তি মিললেও, আজ সোমবার ভোর থেকে আবারও শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। সকাল ৮টার পর তা রূপ নেয় মুষলধারে। এতে আগের দিনের পানি নেমে যাওয়ার আগেই নতুন করে তলিয়ে যায় মালিবাগ, মৌচাক, বনানী, কাকলী, মিরপুর, ইসিবি চত্বর এবং কুড়িল বিশ্বরোড এলাকার প্রধান প্রধান সড়ক।
সড়কে পানি জমে যাওয়ায় ব্যক্তিগত গাড়ি, অফিস বাস ও গণপরিবহনের গতি ধীর হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় জলমগ্ন রাস্তায় যানবাহন বিকল হয়ে পড়ায় মাইলের পর মাইল জুড়ে সৃষ্টি হয় স্থবিরতা।
বাসের জন্য হাহাকার, রিকশায় চড়া ভাড়া
বৃষ্টির কারণে সকাল থেকেই রাস্তাঘাটে বাসের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক অনেক কম। ফলে প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডেই দেখা গেছে অফিসগামীদের উপচে পড়া ভিড়।
মালিবাগ রেলগেট মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ সানজিদা সুলতানা নামের এক চাকরিজীবী নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "রামপুরার অফিসে সময়মতো পৌঁছাতে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আগেভাগে বের হয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও কোনো বাস পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে রিকশা নিতে চাচ্ছি, কিন্তু যে পথের স্বাভাবিক ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা, আজ সেখানে ১৫০ টাকা দাবি করা হচ্ছে।"
অনুরূপ দুর্ভোগের কথা জানান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবিদ ইসলাম। আজ তাঁর ক্লাস টেস্ট থাকায় মালিবাগ আবুল হোটেল মোড় থেকে হুড়োহুড়ি করে রাইদা পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন তিনি। আবিদ বলেন, "ভিড়ের মধ্যে বাসে উঠতে গিয়ে ছাতা থাকা সত্ত্বেও পুরো ভিজে গেছি। এই ভেজা পোশাকে পরীক্ষা কীভাবে দেব, তা-ই ভাবছি।"
বাসের ভেতরেও বৃষ্টির জল, ফ্লাইওভারে আশ্রয়
এদিকে সড়কে চলাচল করা গণপরিবহনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার চিত্রও ফুটে উঠেছে এই বৃষ্টিতে। অনেক বাসের জানালা ভাঙা থাকায় এবং লক নষ্ট হওয়ায় বাসের ভেতরেই পানি চুইয়ে পড়ছে। রাইদা পরিবহনের এক বাসের সহকারী আয়নাল বলেন, "গাড়ির দুটো গ্লাস এমনিতেই ভাঙা, বাকিগুলো দিয়েও পানি আসছে। যাত্রী তুলব নাকি পানি আটকাব?"
বৃষ্টির তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ছাতা বা রেইনকোট দিয়েও সাধারণ মানুষ নিজেদের রক্ষা করতে পারছিলেন না। প্রগতি সরণির নতুনবাজার ওভারব্রিজের নিচে ও ওপরে বহু মানুষকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। রিয়াদ নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, "এত ভারী বৃষ্টিতে ছাতাও কাজ করছে না। শরীর ভিজে যাচ্ছে দেখে ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়েছি।"
ট্রাফিক বিভাগের বিকল্প রুট ব্যবহারের পরামর্শ
টানা বৃষ্টিতে মালিবাগ, মৌচাক ও গুলশান-বনানী রুটে তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান ট্রাফিক বিভাগ থেকে নগরবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে। ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাময়িকভাবে এসব রুট এড়িয়ে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের জন্য ঢাকাবাসীকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পিডিএস/এমএইউ









































