সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র চিরচেনা রূপ

দিনপঞ্জির পাতা উল্টে চলছে আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ। শাশ্বত বাংলার রূপ অনুযায়ী এখন মাঠ-ঘাট ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার কথা। কখনো কখনো একটানা দুই-তিন দিন বর্ষণের মেঘে আকাশ কালো হয়ে থাকার কথা থাকলেও, বাংলার সেই চিরচেনা রূপ আজ যেন এ দেশের মানুষের কাছেই অচেনা হয়ে যাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আষাঢ়ের অস্তিত্ব থাকলেও আকাশে নেই মেঘের ঘনঘটা, প্রকৃতিতেও নির্দিষ্ট সময়ে দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বিপন্ন প্রকৃতি
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষা এখন আর প্রকৃতির নিয়মে আসে না, আসে কেবলই ক্যালেন্ডারের নিয়ম মেনে। আষাঢ়ের এই ভরা যৌবনেও সিরাজগঞ্জের খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি জমেনি। নদী-নালার সেই চেনা পানির ‘ছলাৎ ছলাৎ’ শব্দ আজ আর কোথাও শোনা যায় না। চারদিকে এক ধরনের শুকনো ও গুমোট আবহাওয়া। মাঝেসাঝে সামান্য বৃষ্টি হলেও তা প্রতি বছরের মতো চেনা আষাঢ়ের ঢল নামাতে পারছে না। প্রকৃতির এই বিমুখতা সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ জীবন আর চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতিকে এক বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে।
ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই ও জীবনযুদ্ধ
প্রকৃতির এমন প্রতিকূলতার মাঝেও গ্রামীণ জনপদে পানির খোঁজে জাল আর খলইয়ের লড়াই থেমে নেই। খাল-বিলে সামান্য যেটুকু পানি রয়েছে, তাতেই আশার আলো খুঁজছেন শৌখিন ও পেশাদার মাছ শিকারিরা। যেখানেই সামান্য একটু পানি জমছে, সেখানেই তারা জাল নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন। জালে পর্যাপ্ত মাছ আটকানোর আশায় বুক বেঁধে বারবার জাল ফেলছেন তারা।
হালিম নামের এক শৌখিন শিকারি বলেন, "সারাদিনের খাটুনি শেষে অল্প-স্বল্প যা-ই মাছ মিলুক না কেন, তাতেই আমরা আনন্দ পাই।" তবে পেশাদার শিকারিদের গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং জীবনযুদ্ধের। জেলে স্বপন দাস বলেন, "সামান্য যা মাছ পাই, তা নিয়ে ছুটে যাই বিকেলের কিংবা রাতের বাজারে। মাছ বিক্রি করে যে টাকা মেলে, তা দিয়ে চাল-ডাল আর নিত্যপ্রয়োজনীয় সওদা করে তবেই বাড়ি ফিরি।"
প্রবাদ ভাঙার নির্মম বাস্তবতা
নাটুয়াপাড়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বকুল আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ আর বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে আজ বদলে যাচ্ছে আমাদের চেনা ঐতিহ্য। রূপসী বাংলার সেই ভরা নদী-নালা আর মাছের প্রাচুর্য এখন কেবলই অতীত। ফলে, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র মতো চিরন্তন বাক্যে আজকের মানুষ আর আগের মতো বিশ্বাস রাখতে পারছে না। জীবনধারণের এই নির্মম বাস্তবতার কাছে বাঙালির শত বছরের প্রচলিত প্রবাদ বাক্যগুলো আজ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।"
পিডিএস/এমএইউ









































