মো. রেজাউল করিম রনি

  ৪ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

চায়না দুয়ারী জাল : জলজ জীববৈচিত্র্যের নীরব ঘাতক

বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমিতে সমৃদ্ধ এই দেশ একসময় দেশীয় প্রজাতির মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। পুঁটি, মলা, ঢেলা, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, খলিশা, চিংড়ি, টাকি, বাইনসহ অসংখ্য দেশীয় মাছ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির অন্যতম উৎস ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নানা কারণে আজ এসব মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে, আবার অনেক প্রজাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এই সংকটের পেছনে যেসব কারণ দায়ী, তার মধ্যে চায়না দুয়ারী জালের অবাধ ব্যবহার অন্যতম।

চায়না দুয়ারী জাল মূলত অত্যন্ত সূক্ষ্ম ফাঁসযুক্ত একটি মাছ ধরার জাল, যা পানিতে থাকা ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের জলজ প্রাণীকেই আটকে ফেলে। সাধারণ জালে যেখানে নির্দিষ্ট আকারের মাছ ধরা পড়ে, সেখানে চায়না দুয়ারী জাল মাছের পোনা, ডিম, ক্ষুদ্র চিংড়ি, ব্যাঙাচি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীকেও রেহাই দেয় না। ফলে এটি শুধু মাছ আহরণের একটি উপকরণ নয় বরং জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের একটি মারাত্মক মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীর একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র রয়েছে। মাছের ক্ষেত্রেও তাই। একটি মাছ বড় হয়ে ডিম ছাড়ে, সেই ডিম থেকে পোনা জন্ম নেয় এবং পরবর্তীতে তা পূর্ণাঙ্গ মাছে পরিণত হয়। কিন্তু চায়না দুয়ারী জালের কারণে মাছের এই স্বাভাবিক জীবনচক্র মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পোনা ও কিশোর মাছ ধরা পড়ায় তারা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে।

এই জালের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর নির্বিচার চরিত্র। এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতি বা আকারের মাছ ধরে না বরং পানিতে যা পায় তাই আটকে ফেলে। ফলে দেশীয় মাছের পাশাপাশি বহু উপকারী জলজ প্রাণীও ধ্বংস হয়ে যায়। এতে জলাশয়ের খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়। একসময় যে খাল-বিল ও জলাভূমিতে নানা প্রজাতির মাছ ও প্রাণীর বিচরণ ছিল, সেখানে এখন প্রাণবৈচিত্র্যের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দেশীয় মাছের বিলুপ্তি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয় এটি জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণে ছোট দেশীয় মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব মাছে ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন এসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের জন্য দেশীয় মাছ অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু মাছের উৎপাদন কমে গেলে মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চায়না দুয়ারী জাল একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ। অনেক জেলে ও মাছ শিকারি স্বল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়ার আশায় এই জাল ব্যবহার করেন। প্রথমদিকে এতে কিছুটা লাভবান হওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে জলাশয়ে মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও হ্রাস পায়। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক লাভের আশায় তারা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবিকার ভিত্তি দুর্বল করে তুলছেন। যে জলাশয় থেকে বছরের পর বছর মাছ আহরণ করা সম্ভব ছিল, সেখানে মাছের সংকট তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন মৎস্যজীবীরাই।

বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধে আইন প্রণয়ন এবং অভিযান পরিচালনা করেছে। মৎস্য সংরক্ষণ আইনেও ক্ষতিকর জালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক এলাকায় এখনো চায়না দুয়ারী জালের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা, সচেতনতার অভাব এবং সহজলভ্যতার কারণে এই জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয় প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা। মানুষকে বুঝতে হবে যে আজ যে পোনা মাছ ধরা হচ্ছে, সেটিই আগামী দিনের মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্য বিভাগ, পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মসজিদের খুতবা, বিদ্যালয়ের পাঠক্রম, সামাজিক সভা এবং গণসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার পদ্ধতি ব্যবহারে জেলেদের উৎসাহিত করতে হবে।

দেশীয় মাছ আমাদের কেবল খাদ্য নয় এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অংশ। বাংলার সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে দেশীয় মাছের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অথচ অব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ এবং চায়না দুয়ারী জালের মতো ক্ষতিকর উপকরণের কারণে আমরা ধীরে ধীরে এই সম্পদ হারিয়ে ফেলছি। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো দেশীয় অনেক মাছের নাম শুধু বইয়ের পাতায় খুঁজে পাবে, বাস্তবে নয়।

তাই সময় এসেছে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার। মাছের পোনা নিধন বন্ধ করতে হবে, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি দেশীয় মাছ রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণী রক্ষা করা নয় বরং একটি প্রজাতি, একটি পরিবেশ এবং একটি ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। চায়না দুয়ারী জালের বিরুদ্ধে আজকের কঠোর অবস্থানই আগামী দিনের সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ।

লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়