reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ৮ ঘণ্টা আগে

বাজেটের সফল বাস্তবায়ন আমাদের কাম্য

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ হয়েছে জাতীয় সংসদে। গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। বিশাল এই বাজেটে ঘাটতিও বিশাল। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের বিশাল এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল জয়ের মাধ্যমে গঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট।

বলা সংগত, বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের একটি বার্ষিক হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন একসময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতের চাপ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার সঙ্গে লড়াই করছে; অন্যদিকে নতুন করে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক আস্থার পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। যদিও প্রথম দৃষ্টিতেই বাজেটটি একটি উচ্চাভিলাষী দলিল বলে মনে হয়। সরকার ৬.৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে এবং একইসঙ্গে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য স্থির করেছে। কাগজে-কলমে এই লক্ষ্যগুলো আকর্ষণীয়। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা অনেক সময় বাজেট বক্তৃতার চেয়ে কঠিন হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এসব লক্ষ্য অর্জন শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল। বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত অংশ নিঃসন্দেহে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা। বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই একটি মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি- রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশের সমস্যা করের হার নয়; সমস্যা করের পরিধি। দেশের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা কর নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার, কর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল নজরদারি এবং কর ফাঁকির সংস্কৃতি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। তবে তা যদি আবারও তৈরি হয়, তাহলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং আর্থিক ভারসাম্য সবকিছুই চাপে পড়ে যেতে পারে।

বলা বাহুল্য, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত সংস্কার প্রশ্নে। তবু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তির জায়গাগুলো এখনো অটুট রয়েছে। দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি খাতের সক্ষমতা, কৃষির স্থিতিস্থাপকতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে। নতুন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সঠিক নীতি সহায়তা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারও উচ্চপ্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারবে। আমরা আশা করি, সরকার একটি আত্মনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষে জাতির সামনে যে বাজেট তুলে ধরেছে তার ইতিবাচক বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন করা উচিত। আরো প্রয়োজন তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়