অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতে নজর দেওয়া জরুরি

বাংলাদেশের কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি দেশের বর্তমান বাস্তবতার একটি শক্ত ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করেছে। স্বাধীনতার পর দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন, যা আজকের দিনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৬০ লাখ টনেরও বেশি। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি সক্ষমতার একটি স্বচ্ছ প্রতিফলন। একসময় দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা ও খাদ্যাভাবের প্রতীক হিসেবে পরিচিত দেশটি আজ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরও বলা প্রাসঙ্গিক যে, খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৃষি বাজেটের যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চমূল্যস্ফীতি এবং কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো উচিত ছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে বরাদ্দ কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক। কারণ সম্প্রতি কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং চাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কৃষিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃষি। তাই শুধু টাকার অঙ্কে নয়, মোট বাজেটের অনুপাতে কৃষি খাতের বরাদ্দ বাড়ানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং কৃষি খাতের স্থবিরতা আরো প্রকট হতে পারে।
চলতি অর্থবছরে ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য। এর মধ্যে শস্য কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩.৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২.৩৭ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল; যা খুবই কম। ফসল কৃষি খাতের বরাদ্দে আগের বছরের সংশোধিত বরাদ্দ থেকে ১৮.২১ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা কমিয়ে রাখা হয় ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে কৃষি খাতের হিস্যা বাড়ানো উচিত। বৃহত্তর কৃষি খাতে মোট বাজেটের ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ এবং ভর্তুকিতে মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
বলা বাহুল্য, পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন মোটেও কৃষির মৌলিক গুরুত্বকে হ্রাস করতে পারেনি। বাস্তবতা হলো, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান রক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় করতে, কৃষি এখনো অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে অটুট অবস্থানে রয়েছে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের জীবিকা, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা সরাসরি এই খাতের সঙ্গে জড়িত। এটি দেশের সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বিশেষভাবে বলা যায়, কৃষি কেবল উৎপাদনশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি সামাজিক নিরাপত্তা, জীবনমান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেই বাস্তবতায় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত শক্ত করা এবং জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে কৃষি খাতে বিশেষ নজর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
"





































