রেজাউল করিম খোকন

  ৯ ঘণ্টা আগে

মতামত

নতুন গতি ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু থাকছে বাজেটে?

দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে ফের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। দেশের ভঙ্গুর দশা থেকে উত্তরণ এবং স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একটি বিশেষ কৌশলগত রূপরেখা ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এবারের বাজেটে শুধু ঘাটতি পূরণের প্রথাগত হিসাবনিকাশ নয়, বরং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। খাদের কিনারে পৌঁছানো অর্থনীতিকে টেনে তুলতে এই বাজেটকে একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমিত সম্প্রসারণ, ব্যাপক অর্থ পাচার, ডলারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের চরম দুর্বলতার ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এই ক্রান্তিকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার মনে করছে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি। নতুন বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, একটি বড় আকারের বা উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করা হয়তো সহজ, কিন্তু বর্তমানের ভঙ্গুর ও ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা ও টেকসই সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

এই কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। এই দর্শনের মূল অঙ্গীকারই হলো- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মকাণ্ডের সুফল যেন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন সমাজের সর্বস্তরের ও সব শ্রেণিপেশার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়। বিশেষ করে, তীব্র মূল্যস্ফীতির এ সময়ে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সরাসরি আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দেওয়াকে এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশের এই নাজুক অর্থনীতিকে টেনে তুলতে কেবল গতানুগতিক বরাদ্দ দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং প্রকৃত পুনরুদ্ধারের জন্য দরিদ্র মানুষের সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং সৃজনশীল অর্থনীতির মতো সম্ভাবনাপূর্ণ খাতগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে।

বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তলানিতে রয়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে সরকারের নেতৃত্বে উন্নয়ন বাজেটের আকার বড় করা প্রয়োজন। এর ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও তা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি যদি ২ শতাংশও বাড়ে, তবে তা অর্থনীতির জন্য মন্দ নয়; বরং এটি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সাহায্য করবে। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেশ কম। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগের হার জিডিপির বর্তমান ২৭-২৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে প্রথম বাজেটকে অর্থনীতির পুনর্গঠনের মজবুত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এমনকি ঈদের ছুটির মধ্যেও তিনি বাজেট নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৯ শতাংশ বেশি। তবে এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের বিপরীতে আয়ের খাত নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরেই সরকার রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে, যার পরিমাণ গত ১০ মাসেই এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একটি বাজেট মূলত ব্যয়, আয় ও ঘাটতির ত্রিমাত্রিক সমন্বয়ে গঠিত।

নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্বার্থে বাজেটে ব্যয় বাড়াতে চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো এই বিশাল ব্যয়ের প্রয়োজনীয় অর্থ আসলে কোথা থেকে আসবে? বর্তমানে দেশের অর্থনীতির আকার ও বাজেটের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও, সেই তুলনায় আমাদের রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি বছরই একটি বড় ধরনের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, কিন্তু বছর শেষে তা অধরাই থেকে যায়। এই ব্যর্থতার পেছনে প্রধান কারণ হলো, আমাদের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়ন রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কেবল অর্থনৈতিক নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সুশাসন এই দুই ধারাকে একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারলেই দেশের উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে যাবে।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা ভুগছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন ও রূপান্তর ঘটে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীলতা এসেছে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। বেড়ে গেছে জ্বালানির দাম। কারখানাগুলো উৎপাদন সক্ষমতায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছ। শুধু গ্যাস-সংকটের কারণে গত চার বছরে দেশের একটি শিল্প গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। দেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা কমতির দিকে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব। নতুন বিনিয়োগ কম। চলছে ব্যয় সাশ্রয় ও কর্মী ছাঁটাই। নতুন নিয়োগের সংখ্যা প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জুন অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করবেন। এটিই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসায় গতি ফেরানো, বিনিয়োগ চাঙা করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোই এখন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে নজর রয়েছে সবার।

প্রথমেই সরকারের উপলব্ধি করা দরকার, দেশের অর্থনীতি এখনো সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই অর্থনীতির সুস্থ হয়ে উঠতে সময় লাগবে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে বর্তমানে সংকটে থাকা বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে বিদ্যমান বিনিয়োগই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক অবদান রাখার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বিনিয়োগকে দেখা হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে। তিন বছর ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমছে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে কমে হয় যথাক্রমে ২৪ দশমিক ১৮ এবং ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সর্বশেষ গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) সাময়িক হিসাবে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা গত অর্থবছরের একই সময়ে তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি কম হওয়ার অর্থ হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ কমেছে। উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক অস্থিরতার বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়া রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই হার সাধারণত ১০ শতাংশের ওপরে থাকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসা অর্ধেক কমে গিয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা এখনো ১৮-২০ শতাংশ কম। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা কম থাকায় প্রতিষ্ঠানে চলতি মূলধনে টান পড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমাতে বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ থাকবে। অন্তত ১৯ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমানো হতে পারে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমে যাওয়ার বিষয় পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই সূচকেও ওঠে এসেছে। অর্থনীতির প্রধান চার খাত- উৎপাদন, কৃষি, নির্মাণ ও সেবা নিয়ে এই সূচক প্রণয়ন করা হয়। পিএমআই অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে অর্থনীতি সম্প্রসারণের গতি কমেছিল। পরের মাসে গতি কিছুটা বাড়লেও মার্চে কমে। গত এপ্রিলে পিএমআই সূচকের মান সামান্য বেড়ে হয় ৫৪ দশমিক ৫ পয়েন্ট।বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমাতে এবারের বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ থাকবে। অন্তত ১৯ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমানো হতে পারে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের কর ছাড়ের সুবিধা দিতে পারে সরকার। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব লাইসেন্স ও অনুমোদন লাগে, সেগুলো স্বল্প সময়ে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে একগুচ্ছ ঘোষণাও থাকতে পারে বাজেটে।

বাজেটের আগেই দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্পকারখানার জন্য থাকছে। এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে বেসরকারি খাত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনিয়োগ সেবা আরো সহজ করতে বিডা, বেজা, বেপজা, পিপিপিএ এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মতো বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একীভূত করা; চীনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে সেখানে বিডার অফিস চালু ইত্যাদি।

বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এফডিআইয়ে গতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু চেষ্টা করলেও ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি। নতুন সরকারও চেষ্টা করছে। তবে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিগগিরই এফডিআইয়ে গতি পাবে এমনটা কেউ বলতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ (জুলাই-মার্চ) মাসে ১০০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ। তার মানে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে সাড়ে ২৩ শতাংশ। দেশের ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। দেশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা যদি মসৃণ হয়, তাহলে বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনিয়োগ সেবা আরো সহজ করতে বিডা, বেজা, বেপজা, পিপিপিএ এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মতো বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একীভূত করা; চীনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে সেখানে বিডার অফিস চালু ইত্যাদি।

সামগ্রিকভাবে এই পরিকল্পনা বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সহায়ক হবে। ইদানিং বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের হুজুগ পড়েছে। গত কয়েক মাসে হাজার হাজার কারখানা শ্রমিকের চাকরি চলে গেছে। একদিকে ছাঁটাই হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম। তাতে বেকার পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হচ্ছে। ২০২৪ সাল শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তার আগের বছর (২০২৩ সাল) এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ২৫ লাখ। গত বছরের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। এই মুহূর্তে যেকোনো উপায়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি চাহিদা কমিয়ে রাখে। তা ছাড়া মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে টাকার অবমূল্যায়নে চাপ বাড়বে। সেটি হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে। তাতে ব্যবসার খরচ বাড়বে।

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় মধ্য মেয়াদে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে। নতুন কূপ খনন করার মাধ্যমে জ্বালানি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে। ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার কাজ শুরু করতে হবে। যেসব সমস্যা বেশি ভোগাচ্ছে, সেগুলো আগে সমাধান করতে হবে। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকারের কাছে দেশের সব মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তবে সবার প্রত্যাশা রাতারাতি পূরণ করা অবাস্তব ব্যাপার। ধাপে ধাপে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যে গভীর সংকট চলছে তা দূর হয়ে যাবে নিশ্চয়ই। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে যে খরাভাব চলছে, সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে তা কাটিয়ে চাঙ্গা ভাব ফিরিয়ে আনতে নতুন অর্থ বছরের বাজেট কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা। জনগণ এখন অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে, বহুল প্রত্যাশিত আসন্ন বাজেটের দিকে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়