রামিসা হত্যা মামলার রায় অবিলম্বে কার্যকর হোক

দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক অন্যতম নজির স্থাপিত হলো গত রবিবার এক দম্পতির ফাঁসির আদেশের মধ্য দিয়ে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধের মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে শেষ হলো মামলার বিচারিক কার্যক্রম। এতে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার গায়ে যে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ লেপ্টে আছে, সেখানে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো। ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রবিবার দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত। যেখানে বিচারহীনতা, দীর্ঘসূত্রতাই আমাদের তিক্ত বাস্তবতা; সেখানে স্বল্প সময়ে এই রায় অনন্য দৃষ্টান্ত। আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই।
বলা সংগত, এ মামলায় যে দ্রুত বিচার হবে এবং বিচারে যে প্রধান আসামি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে- সেটি মোটামুটি অনুমিতই ছিল। যদিও বিচারককে রায় দিতে হয় মামলার অভিযোগপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। জনগণের মতামতের ওপর বিচারের রায় নির্ভর করে না। কিন্তু এও তো ঠিক, কোনো একটি ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলে; সমাজ ও রাষ্ট্রে তোলপাড় শুরু হলে, সেটি নিয়ে একটি অলিখিত চাপ বিচারকের থাকেই। সেখানে যদি রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হয়, তখন বিচারককে তা নিয়েও ভাবতে হয়। এদিকে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ভুক্তভোগী পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু। বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, অতীতে এ ধরনের মামলার বিচারকাজ এত কম সময়ে সম্পন্ন হয়নি। আলোচিত মামলাটির বিচার শুরু থেকে রায়ের পর্যায়ে এসেছে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে। এর আগে গত বছর মাগুরায় আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয় ১৪ কার্যদিবসে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে, রায় দ্রুত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রায় কার্যকর কি দ্রুত হয়েছে? তথ্য-উপাত্ত বলছে, রায় কার্যকর হওয়ার নজির অত্যন্ত হতাশাজনক।
বলা বাহুল্য, ১৯ মে পাশের ফ্ল্যাটে অবর্ণনীয় নৃশংসতার শিকার হয় সাত বছরের শিশু রামিসা। এ ঘটনার প্রতিবাদে গোটা দেশ ফুঁসে ওঠে। ঘটনার শুরু থেকেই সরকারের তরফ থেকে তৎপরতা দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার বাসায় ছুটে যান এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। দ্রুতই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন দিনের মধ্যে ডিএনএ ও ফরেনসিক রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় চার্জশিট দেওয়া হয়। বলা প্রাসঙ্গিক যে, যেসব ঘটনা আলোচিত হয়, প্রতিবাদ হয়; সেসব ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া গতি পায়। কিন্তু বাকি ঘটনাগুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। এমনকি আলোচিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও নিম্ন আদালতের রায় উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর আটকে থাকে। রামিসার মামলা দ্রুত বিচারের মুখ দেখলেও চট্টগ্রামে শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার মামলা ঝুলে আছে। এমন উদাহরণ একটি-দুটি নয়। গত ১০ বছরে দেশে ছয় হাজারের বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তিন শতাধিক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের পরিবার এখনো বিচার পায়নি। আমরা মনে করি, রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুত রায়ের ক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে, তার রায় কার্যকরের ক্ষেত্রেও অক্ষুণ্ণ থাকবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
"





































