নুসরাত জাহান বৈশাখী
মুক্তমত
নীরব মৃত্যুর পথে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণভূমি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। যেখানে প্রকৃতি যেন তার সৌন্দর্য নিজ হাতে সাজিয়েছে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই জেলা নদী, হাওর, বিল এবং সবুজ প্রকৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। অসংখ্য ছোট-বড় হাওর নিয়ে গঠিত হওয়ায় এই জেলাকে হাওরকন্যা বলা হয়। এই হাওরকন্যার বুকে রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট এবং অন্যতম জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর। যার আয়তন প্রায় ১২,৬৬৫ হেক্টর। এই টাঙ্গুয়ার হাওরকে আবার মাদার অব ফিসারিজ, অর্থাৎ সব হাওরের মা বলা হয়। শীতকালে এখানে বিভিন্ন স্থানে থেকে আগমন ঘটে অসংখ্য পরিযায়ী পাখির। সুনামগঞ্জের এই টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়।
একটা সময় ছিল যখন টাঙ্গুয়ার হাওরে গেলে মনে হতো প্রকৃতি যেন মানুষের জন্য তার সবচেয়ে সুন্দর দরজাটি খুলে দিয়েছে। যতদূর চোখ যায় বিস্তীর্ণ জলরাশি, দূরে মেঘালয়ের পাহাড়, আকাশজুড়ে উড়ে বেড়ানো পরিযায়ী পাখি আর চারপাশে এক গভীর নীরবতা। সেই নীরবতারও একটা ভাষা ছিল। ঢেউয়ের শব্দ, বাতাসের মৃদু সুর আর পাখির ডাক মিলে সৃষ্টি করত এক অনন্য সংগীত। কিন্তু আজ সেই সংগীতের সুর ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কারণ টাঙ্গুয়ার হাওর এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের গন্তব্যের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের কেন্দ্র। আর এই অতিরিক্ত পর্যটনের চাপেই ধ্বংসের মুখে পড়েছে হাওরের অমূল্য জীববৈচিত্র্য্য। আজ টাঙ্গুয়ার হাওরে গেলে প্রায়ই দেখা যায় উচ্চস্বরে গান বাজছে, নৌকার পর নৌকা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাচ্ছে, পর্যটকদের চিৎকারে মুখর চারদিক। মনে হয় যেন কেউ প্রকৃতির বুকের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ এই হাওর বিখ্যাত ছিল তার শান্তির জন্য, তার নিস্তব্ধতার জন্য।
মানুষ এখানে আসত শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে। এখন সেই কোলাহলই হাওরের নতুন পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিযায়ী পাখিরা। প্রতি বছর শীতকালে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পাখি উড়ে আসে টাঙ্গুয়ার হাওরে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা এখানে আশ্রয় খুঁজে পায়, খাদ্য খুঁজে পায়, নিরাপত্তা খুঁজে পায়। কিন্তু মানুষের বাড়তি উপস্থিতি, শব্দদূষণ আর অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল তাদের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। যে পাখিগুলো একসময় নির্ভয়ে হাওরের জলে ভেসে বেড়াত, তারা এখন মানুষের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে উড়ে যায়। প্রকৃতির এই নীরব বাসিন্দারা আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করে না, কোনো প্রতিবাদ জানায় না। তারা শুধু ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। পাখিদের পাশাপাশি বিপন্ন হচ্ছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং পুরো বাস্তুতন্ত্র। প্রতিদিন পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য পানিতে জমা হচ্ছে এবং ফেলে আসে অসচেতনতার চিহ্ন।
এখানে প্রতিটি পাখি, প্রতিটি মাছ, প্রতিটি জলজ উদ্ভিদ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই সম্পর্কের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রকৃতির ভারসাম্য ভাঙতে সময় লাগে না, কিন্তু সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে লেগে যায় বহু বছর। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই ধ্বংসকে নিজেদের চোখের সামনেই ঘটতে দেখছি। সবাই জানে সমস্যা কোথায় এবং এর পরিণতি কী হতে পারে, তবুও সবাই যেন উদাসীন। আমাদের আচরণ অনেকটা এমন যে, একটি সুন্দর বাগানে বেড়াতে গিয়ে ফুল ছিঁড়ে, গাছ ভেঙে, মাটি নষ্ট করে ফিরে আসছি , তারপর আবার সেই বাগানের সৌন্দর্যের প্রশংসা করছি প্রকৃতপক্ষে, টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো প্রচারণা নয়, নতুন কোনো পর্যটন উৎসবও নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সংরক্ষণ। পর্যটকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, শব্দদূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, প্লাস্টিকমুক্ত পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
পর্যটকদেরও বুঝতে হবে, প্রকৃতিকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার ছবি তোলা নয়, তার অস্তিত্ব রক্ষা করাও ভালোবাসারই অংশ। আমরা যদি আজ টাঙ্গুয়ার হাওরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করি, তাহলে একদিন হয়তো এই হাওর তার প্রাণশক্তি হারাবে। পরিযায়ী পাখিরা অন্য কোথাও চলে যাবে, মাছের সংখ্যা কমে যাবে, জলের স্বচ্ছতা হারিয়ে যাবে। তখন হয়তো পর্যটকরাও আর আসবে না। টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল সুনামগঞ্জের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের সম্পদ। এটি আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, আমাদের পরিচয়ের অংশ। এই হাওরকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি জলাভূমিকে রক্ষা করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত প্রকৃতি সংরক্ষণ করা। আজও ভোরবেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের জলে সূর্যের আলো পড়ে। আজও কিছু পাখি আকাশে ডানা মেলে উড়ে যায়। আজও বাতাসে ভেসে আসে প্রকৃতির অপূর্ব গন্ধ। কিন্তু সেই সৌন্দর্য চিরদিন থাকবে এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার। এখনই সময় প্রকৃতির পাশে দাঁড়ানোর। নইলে একদিন হয়তো টাঙ্গুয়ার হাওর থাকবে, কিন্তু তার প্রাণ থাকবে না। থাকবে শুধু জল, আর সেই জলের বুকে ভেসে বেড়াবে অবহেলার ইতিহাস।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
"





































