মো. বাইজিদ শেখ

  ৮ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

মেধাপাচারের বাস্তবতা ও এক রক্তক্ষরণের গল্প

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিপার্চার লাউঞ্জের বাইরের দৃশ্যটা একটু খেয়াল করলেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। লাগেজ ট্রলির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষের চোখেমুখে বিদায়ের বিষাদ। এক বৃদ্ধ বাবা অশ্রুসজল চোখে জড়িয়ে ধরে আছেন তার সন্তানকে, যে হয়তো বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য পাস করা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে সে পাড়ি জমাচ্ছে উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো দেশে। আত্মীয়স্বজন হাসিমুখে বিদায় জানালেও, এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক চরম বাস্তবতা। আমরা যাকে বলি ‘উচ্চশিক্ষার সুযোগ’, রাষ্ট্রের চোখে তা হলো এক নীরব রক্তক্ষরণ মেধাপাচার বা ব্রেইন ড্রেইন।

মেধা কেন দেশ ছাড়ে? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেধাপাচারের কারণগুলো যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি পদ্ধতিগত ও মানসিক। একজন তরুণ যখন তার সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে, তখন সে চায় তার মেধার সঠিক মূল্যায়ন। কিন্তু বাস্তবে সে দেখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার জন্য দেশে পর্যাপ্ত বাজেট বা আধুনিক ল্যাবরেটরি নেই। মেধার চেয়ে যখন ‘মামা-চাচার জোর’ কিংবা দলীয় পরিচয় চাকরির মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন একজন মেধাবী তরুণ নিদারুণ হতাশায় ভোগে। কোনো নতুন উদ্যোগ বা উদ্ভাবন করতে গেলে পদে পদে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে তরুণদের স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। দেশপ্রেমের অভাব নয়, বরং পদে পদে নিজের মেধার এই অবমূল্যায়নই তাদের বাধ্য করে ভিনদেশে পাড়ি জমাতে, যেখানে তার মেধার কদর আছে এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ রয়েছে।

আবেগের শূন্যতা ও একাকিত্ব : মেধাপাচারের সবচেয়ে করুণ দিকটি লুকিয়ে আছে আমাদের পারিবারিক কাঠামোতে। যে মা-বাবা তাদের জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করলেন, জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে তারা হয়ে পড়েন বড্ড একা। সন্তান বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, বড় গাড়ি-বাড়ি হাঁকাচ্ছে, রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে- এসব শুনে হয়তো সাময়িক গর্ব হয়। কিন্তু ঈদের সকালে যখন সন্তানের শূন্য ঘরটার দিকে চোখ পড়ে, তখন বুকের ভেতর যে হাহাকার তৈরি হয়, তা কোনো ডলার বা পাউন্ড দিয়ে মেটানো যায় না। স্কাইপ বা হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনেই আটকে থাকে মা-বাবার আদর। অনেক ক্ষেত্রে এই নিঃসঙ্গ মা-বাবার শেষ আশ্রয় হয় কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা কেয়ারগিভারের হাত। দেশের মেধা চলে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের সমাজ হারাচ্ছে তার অমূল্য পারিবারিক উষ্ণতা।

রাষ্ট্রের বিনিয়োগ বনাম মেধার আইনি অধিকার : মেধাপাচারের বিষয়টি কেবল আবেগ বা অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের আইনি ও কাঠামোগত নীতিমালা।

সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার ও দেশত্যাগের অধিকার রয়েছে। তাই আইন করে কাউকে দেশে আটকে রাখা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় একটি নৈতিক ও আইনি শূন্যতা। বাংলাদেশ সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি হওয়া একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী যখন দেশ ছেড়ে চলে যান, তখন রাষ্ট্র তার বিনিয়োগের কোনো প্রতিদান পায় না। উন্নত অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় খরচে পড়াশোনা করলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দেশে সেবা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা বা ‘বন্ড’ থাকে। আমাদের দেশে সরকারি বৃত্তিতে বিদেশে পড়তে গেলে বন্ড সই করানো হলেও, তার সঠিক প্রয়োগ বা আইনি নজরদারি অত্যন্ত দুর্বল। অনেকেই চুক্তি ভঙ্গ করে আর ফিরে আসেন না এবং রাষ্ট্রও সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে না।

উত্তরণের পথ : মেধাপাচার পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু একে দেশের স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব। এর জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মেধাস্বত্ব আইনের আধুনিকীকরণ ও কঠোর প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তরুণরা দেশে বসে উদ্ভাবন করতে নিরাপদ বোধ করে। যারা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের দেশের গবেষণায় বা বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন। দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন ও বিনিয়োগ আইনের সহজীকরণ করে তাদের দেশের উন্নয়নে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

মেধাবীরা আসলে দেশ ছেড়ে যেতে চায় না; শেকড়ের টান সবারই থাকে। তারা কেবল চায় একটু সম্মান, নিজের মেধার স্বীকৃতি এবং কাজ করার মতো একটি সুস্থ পরিবেশ। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মাটির নিচের খনিজ নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কগুলোকে যদি আমরা সঠিক আইনি সুরক্ষা, সম্মান ও সুযোগ দিয়ে দেশের মাটিতে কাজে লাগাতে না পারি, তবে আমাদের সব উন্নয়নই একদিন টেকসই মেধার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। আসুন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিই, যেখানে কোনো মেধাবীকে চোখের জলে দেশ ছাড়তে হবে না; বরং পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মেধা ছুটে আসবে এই বদ্বীপের বুকে নতুন কিছু গড়ার নেশায়।

লেখক : তরুণ কলাম লেখক ও শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়