কানিজ সূবর্ণা বাবলি

  ৮ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

মহাকাশের অতন্দ্র চোখ ও আধুনিক যুদ্ধনীতি

মহাকাশের বুকে জেগে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহগুলো আধুনিক সভ্যতার এমন এক অদৃশ্য জাদুদণ্ড যা এক পলকেই বদলে দিতে পারে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের যুদ্ধক্ষেত্রের ভাগ্যলিপি। একবিংশ শতাব্দীর রণক্ষেত্র আর কেবল স্থল জল কিংবা আকাশসীমার চিরাচরিত দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের এক বিশাল অংশ এখন নিঃশব্দে স্থানান্তরিত হয়েছে ভূপৃষ্ঠ থেকে শত শত কিলোমিটার ওপরে মহাকাশের অনন্ত অন্ধকারে। আধুনিক যুদ্ধনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে আজ সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে স্যাটেলাইট নজরদারি বা উপগ্রহভিত্তিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি।

প্রাচীনকালে যুদ্ধের ময়দানে উঁচু পাহাড় কিংবা দুর্গ চূড়া থেকে শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হতো যা সময়ের বিবর্তনে স্থান নেয় স্কাউট বিমান আর ড্রোনে। কিন্তু বর্তমান যুগে যুদ্ধের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করা হাজারো কৃত্রিম উপগ্রহ। এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলো আজ আধুনিক সামরিক কমান্ডের জন্য মহাকাশের চোখ হিসেবে কাজ করছে যা শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ, বাঙ্কারের অবস্থান, ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন এবং সেনা সমাবেশের নিখুঁত চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ধরছে। আধুনিক সামরিক পরিভাষায় একে বলা হয় গোয়েন্দা নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ কৌশল যার মূল ভিত্তিই হলো স্যাটেলাইট।

বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি এবং যুদ্ধাঞ্চলের দিকে তাকালে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্যাটেলাইট চিত্রায়ণ যুদ্ধকৌশলকে আমূল বদলে দিয়েছে। আধুনিক নজরদারি উপগ্রহগুলো মূলত দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সফল হচ্ছে। একটি হলো আলোকচিত্র গ্রহণকারী স্যাটেলাইট যা দিনের আলোয় মেঘমুক্ত আকাশের নিচে অত্যন্ত উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তুলতে পারে। অন্যটি এবং বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি হলো সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার স্যাটেলাইট। এই প্রযুক্তি রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘন মেঘের আস্তরণ এমনকি তীব্র ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও ভূপৃষ্ঠের নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম যা শত্রুপক্ষের জন্য যেকোনো ধরনের গোপন সামরিক প্রস্তুতি লুকিয়ে রাখা অসম্ভব করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিহোল সিরিজের সামরিক স্যাটেলাইটগুলো ভূপৃষ্ঠের মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার আকৃতির বস্তুকেও স্পষ্ট সনাক্ত করতে পারে। এর পাশাপাশি স্পেসএক্স-এর স্টারলিঙ্ক বা ম্যাক্সার প্রযুক্তির মতো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটগুলোর উপস্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্যের একচেটিয়াপাত্ব ভেঙে দিয়েছে।

এখন কেবল পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোই নয় বরং সাধারণ মানুষ এবং সংবাদমাধ্যমও উন্মুক্ত উৎসের গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে যুদ্ধের লাইভ আপডেট পেয়ে যাচ্ছে যা যেকোনো দেশের সামরিক প্রোপাগান্ডা বা মিথ্যা দাবিকে মুহূর্তের মধ্যে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। স্যাটেলাইট নজরদারির এই রাজত্ব শুধু ছবি তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক যুদ্ধনীতিতে এর আরেকটি বড় স্তম্ভ হলো সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা সংকেত গোয়েন্দাগিরি। মহাকাশে থাকা বিশেষায়িত উপগ্রহগুলো শত্রুপক্ষের রাডার তরঙ্গ রেডিও যোগাযোগ মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা থেকে নির্গত ইলেকট্রনিক সংকেত প্রতিনিয়ত চুরি করছে। এর ফলে শত্রু কমান্ডের গোপন বার্তা যেমন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমনি তাদের রাডার স্টেশনগুলোর অবস্থানও চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে।

শুধু তাই নয় স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ছাড়া বর্তমানের শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁত ক্রুজ মিসাইল এবং উপগ্রহ নির্দেশিত বোমার কার্যকারিতা একপ্রকার শূন্য। মার্কিন জিপিএস রাশিয়ার গ্লোনাস কিংবা চীনের বেইদু নেভিগেশন স্যাটেলাইটগুলোর সাহায্য নিয়ে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হাজার মাইল দূর থেকে এসে একদম নির্দিষ্ট জানালার কাঁচ গলিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে যাকে সামরিক ভাষায় বলা হয় সুনির্দিষ্ট বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। তবে এই অত্যধিক স্যাটেলাইটনির্ভরতা আধুনিক যুদ্ধনীতিকে এক নতুন ঝুঁকির মুখেও ঠেলে দিয়েছে যা কৃত্রিম উপগ্রহ বিধ্বংসী অস্ত্রের প্রতিযোগিতাকে উস্কে দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া, চীন এবং ভারত এরই মধ্যে সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মহাকাশে নিজেদের অকেজো কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করার প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে, যার অর্থ দাঁড়ায় ভবিষ্যতের কোনো বড় যুদ্ধে শত্রুর চোখ অন্ধ করে দেওয়ার জন্য মহাকাশে প্রথম আক্রমণ চালানো হতে পারে। এ ছাড়া লেজার রশ্মি বা সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে শত্রুর স্যাটেলাইটকে অকেজো করার প্রযুক্তিও এখন আধুনিক যুদ্ধনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্যাটেলাইট নজরদারির এই বিস্ময়কর উত্থান একদিকে যেমন যুদ্ধকে করেছে অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁত অন্যদিকে তা তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়িয়ে যেকোনো অতর্কিত আক্রমণের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিয়েছে। কারণ মহাকাশের এই অতন্দ্র প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে কোনো দেশের পক্ষে এখন আর বড়সড় সেনা সমাবেশ লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তথ্যই যেখানে আধুনিক যুদ্ধের প্রধান শক্তি সেখানে মহাকাশের এই ডিজিটাল সাম্রাজ্য যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে একবিংশ শতাব্দীর রণক্ষেত্রে সেই দেশই আধিপত্য বিস্তার করবে। তবে এই মহাকাশ প্রযুক্তি যেন কেবল যুদ্ধের ধ্বংসলীলাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে বরং তা আগামী দিনে পৃথিবীর বুকে স্থায়ী শান্তি ও বিশ্বব্যাপী মানবকল্যাণের পথকে সুগম করবে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়