মরিয়ম খানম সেতু
দৃষ্টিপাত
ভালো নেই পৃথিবী, দায় আমাদেরই

পৃথিবী আজ নিঃশব্দে কাঁদছে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে জমছে অস্থিরতা, বৈষম্য আর ক্লান্তি। প্রকৃতি, রাষ্ট্র এমনকি মানুষ- সবস্তরেই এক অদৃশ্য অসুখ বাসা বেঁধেছে। তাই প্রশ্ন জাগে- কী হয়েছে পৃথিবীর? ক্যানসারে আক্রান্ত পৃথিবী। ‘ক্যানসারে আক্রান্ত দেহ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে, তেমনি আজ ভেঙে পড়ছে পৃথিবী।’ ভালো নেই পৃথিবীর জলবায়ু, শান্তি নেই রাষ্ট্রে, যুদ্ধে ব্যস্ত বিশ্ব। হিংসা আর জয়ী হওয়ার ধ্বংসাত্মক নেশায় মত্ত। বিশ্বজুড়েই মানুষের বাস, তাই পৃথিবী ভালো না থাকলে, এ পৃথিবীর মানুষও ভালো থাকতে পারে না।
পরিবেশের আজ ভয়াবহ অবস্থা। একসময় যে পৃথিবী ছিল সবুজে ঘেরা, নির্মল বাতাসে ভরা, আজ তা দূষণে জর্জরিত। কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, প্লাস্টিক বর্জ্য- সবমিলিয়ে বাতাস, পানি ও মাটি দূষিত হয়ে পড়ছে। নদীগুলো হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক গতি, বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। এসবের ফল হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন এখন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন নষ্ট করছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। পরিবেশের এরূপ বিপর্যয়ের ফলে অস্বাভাবিক গরম, অতি বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা সবকিছুই মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে। অথচ একটু সচেতনতাই পারে প্রকৃতির সজীবতা ফিরিয়ে দিতে। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কেটে শহর বানানো হচ্ছে। ফলে অক্সিজেনের উৎস কমছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা, বদলে যাচ্ছে ঋতুচক্র, বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অথচ এ সব সমস্যার সমাধান খুবই সহজ- গাছ লাগানো, যত্ন নেওয়া, অপ্রয়োজনে গাছ না কাটা। ছোট্ট পদক্ষেপেই বড় পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব। প্রত্যেকে যদি কেবল এতটুকু চেষ্টা করে যে, রাস্তায় কোনো ময়লা ফেলবে না তাহলেই গোটা শহর পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই প্রকৃতির সজীবতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পৃথিবীর অসুস্থতা কেবল পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও মানুষের মনে। আজকের বিশ্বে এক দেশ আরেক দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। সাহায্যের নামে দেওয়া হয় শর্ত, বিনিয়োগের আড়ালে চাপিয়ে দেওয়া হয় নিয়ন্ত্রণ। ফলে যে দেশ সাহায্য গ্রহণ করে, সে আরো দুর্বল এবং নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ধরনের সাহায্য আসলে সহযোগিতা নয়, বরং আধিপত্য বিস্তারের গোপন কৌশল। পৃথিবীকে ক্যানসার থেকে পরিত্রাণ দিতে প্রয়োজন রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সত্যিকারের বন্ধুত্ব। রাষ্ট্রগুলোর মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে রাষ্ট্রীয় ভেদাভেদ দূর হবে, যুদ্ধের অবসান হয়ে গড়ে উঠবে এক মানবিক পৃথিবী। পৃথিবী কেবল মানচিত্রে বিভক্ত কিছু দেশ নয়, বরং মানুষের সম্মিলিত বাসস্থান। এ বাসভূমিকে বসবাস উপযোগী রাখতে হিংসা, বিদ্বেষ আর সেরা হওয়ার নেশা ভুলে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এই পৃথিবীর নানা প্রান্তে চলছে যুদ্ধ, সহিংসতা আর ক্ষমতার লড়াই। মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, ধ্বংস করছে শহর- এসবের মূল কারণ একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অভাব। মানুষ যখন মানবিকতা হারিয়ে ফেলে তখনই জন্ম নেয় হিংসা, বিদ্বেষ আর সংঘাত। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে অস্থিরতার প্রভাব। প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা আর চাপ মানুষের মনকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। একাকিত্ব বাড়ছে, কমে যাচ্ছে সহানুভূতি। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনেছে কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ মানুষকে বোঝার চেষ্টা না করে হারানোর প্রতিযোগিতায় মত্ত। অথচ মানুষ হিসেবে আমাদের বড় শক্তি হওয়া উচিত ছিল ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
পৃথিবী ভিন্ন কোনো সত্তা নয়, পৃথিবীই আমরা। তাই আমরা যেমন হবো, পৃথিবীও আমাদের প্রতি তেমন হবে। পৃথিবীর অবস্থা ভালো করতে হলে মানুষকে ভালো হতে হবে। মানবের মাঝে মানবিকতা, ভালোবাসা আর সহানুভূতি গড়ে তুলতে পারলে পৃথিবী বদলাবে। ‘হিংসা নয় ভালোবাসা; দখল নয় সহাবস্থান; ধ্বংস নয় সৃষ্টি- এই মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’
আসুন ‘হিংসা, বিদ্বেষ ভুলে যাই,
সুন্দর, নির্মল পৃথিবী সাজাই।’
লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
"





































