মাসুম বিল্লাহ
মুক্তমত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : আশীর্বাদ না সৃজনশীলতার চ্যালেঞ্জ?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। চাকার আবিষ্কার, ছাপাখানা, বিদ্যুৎ, কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেটের মতো প্রযুক্তিগুলো যেমন সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে, তেমনি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তির অন্যতম মাইলফলক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, ব্যবসা, কৃষি, সাংবাদিকতা, শিল্পকলা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ, নাকি এটি মানুষের সৃজনশীলতার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ?
এআইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রয়োজনীয় ফলাফল দিতে পারে এটি। একজন শিক্ষার্থী কোনো জটিল বিষয়ের ব্যাখ্যা কয়েক সেকেন্ডে পেয়ে যাচ্ছে, একজন গবেষক বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনীয় উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারছেন, একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা পাচ্ছেন, আবার একজন কৃষকও আবহাওয়া বা ফসল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরামর্শ নিতে পারছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তির এই নতুন সংযোজন মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সময় ও ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক একটি সংকলিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.১ বিলিয়ন মানুষ এখন সক্রিয়ভাবে এআই ব্যবহার করছে। এমনকি বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা আইবিএম এবং ম্যাককিনসের ডাটা অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৭৭ শতাংশ ডিজিটাল ডিভাইসেই এখন কোনো না কোনোভাবে এআই যুক্ত রয়েছে। মাইক্রোসফট ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মী এবং শিক্ষার্থী বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক কাজে লিংকডইন ওয়ার্ক ট্রেন্ড ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ শতাংশ এআই ব্যবহার করছেন। হয়তো আমাদের নিজেদের অজান্তেই এআইয়ের ব্যবহার আমাদের সৃজনশীলতাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানবজীবনে এআই ব্যবহার অবশ্যই করতে হবে কিন্তু সঠিক নিয়মে।
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই অধ্যয়ন, গবেষণা বা বিশ্লেষণধর্মী কাজের পরিবর্তে সরাসরি এআই থেকে প্রস্তুত উত্তর সংগ্রহ করছে। কোনো রচনা, প্রতিবেদন কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে নিজের মেধা প্রয়োগের বদলে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে কাজের গতি বাড়লেও শেখার গভীরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ শিক্ষা কেবল তথ্য সংগ্রহের বিষয় নয় বরং তা যুক্তি, বিশ্লেষণ, প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। যদি শিক্ষার্থীরা চিন্তার পরিবর্তে প্রস্তুত উত্তরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং শিল্পকলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এআই কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সংবাদ কিংবা চিত্রকর্ম তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু মানবিক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, কল্পনা এবং সামাজিক বাস্তবতার গভীরতা কি সত্যিই কোনো যন্ত্র ধারণ করতে পারে? একটি কবিতার শব্দ হয়তো এআই সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি, সংগ্রামের ইতিহাস কিংবা জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা সেখানে অনুপস্থিত থেকে যায়। এভাবেই মৌলিক উদ্ভাবনী ক্ষমতার লোপ জন্ম দিচ্ছে এক ব্রেন ডেড প্রজন্মের। ফলে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানবিক সৃজনশীলতার বিকল্প হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে এআইয়ের কারণে সৃজনশীলতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, এমন আশঙ্কাও বাস্তবসম্মত নয়। ইতিহাস বলে, নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাজের ধরন পরিবর্তন করে। কিন্তু মানবিক সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নতুন ধরনের সৃজনশীলতার সুযোগ সৃষ্টি করে। একসময় ক্যালকুলেটর আসার পরও গণিতচর্চা বন্ধ হয়নি, কম্পিউটার আসার পরও লেখালেখি হারিয়ে যায়নি। বরং মানুষ নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে প্রযুক্তিকে নিজের কাজে লাগিয়েছে। সুতরাং মূল প্রশ্ন প্রযুক্তির অস্তিত্ব নয় বরং এর ব্যবহার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যদি আমরা চিন্তার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে তা অবশ্যই সৃজনশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি এটিকে একটি সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে এটি আমাদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
একজন শিক্ষার্থী এআইযের সাহায্যে নতুন ধারণা শিখতে পারে, একজন গবেষক তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা নিতে পারেন, একজন লেখক নিজের চিন্তাকে আরো পরিমার্জিত করতে প্রযুক্তির সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন। এ কারণে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা ও সচেতনতা গড়ে তোলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এআই-সাক্ষরতার বিষয়ে পাঠদান চালু করা উচিত। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হয়, আবার কোথায় নিজের চিন্তাশক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার এক বিস্ময়কর অর্জন। এটি আমাদের কাজ সহজ করছে, জ্ঞান অর্জনের নতুন পথ খুলে দিচ্ছে এবং উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। তবে এর অন্ধ ব্যবহার মানবিক সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সহকারী হিসেবে দেখতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের মেধার পরিপূরক হবে, বিকল্প নয়। তাহলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য সত্যিকার অর্থে আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, সৃজনশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
"





































