তাসনিম জাহান খুশবু

  ৭ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষের জীবনসংগ্রাম

নদী কখনো আশীর্বাদ, কখনো অভিশাপ- এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের জনপদ। যে প্রবাহ একদিকে উর্বরতা ও জীবনধারার প্রতীক, সেই একই স্রোত অন্যদিকে নিঃশব্দে গ্রাস করে চলেছে মানুষের অস্তিত্ব, বসতভিটা ও স্মৃতির ভিটেমাটি। নদীভাঙন তাই কেবল একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি এক অবিরাম ভাঙন গাথা, যেখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার ইতিহাসের মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে।

ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের সম্মিলিত অভিঘাতে বাংলাদেশের নদীগুলো ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বর্ষার অতিরিক্ত পানি, উজান থেকে নেমে আসা প্রবল স্রোত, পলি সঞ্চয় ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে তীরবর্তী ভূমি বারবার ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এই ক্ষয়প্রক্রিয়া ধীরে নয়, বরং কখনো কখনো আকস্মিক ও নির্মমভাবে ঘটে, যা মানুষের প্রস্তুতির সকল সুযোগ কেড়ে নেয়।

নদীভাঙনের সবচেয়ে করুণ দিক হলো এর মানবিক অভিঘাত। এক একটি ভাঙন মানে কেবল ঘরবাড়ির বিলুপ্তি নয়, বরং একটি জীবনের শিকড়চ্যুতি। মানুষ তার জন্মভূমি হারায়, হারায় পূর্বপুরুষের স্মৃতি, হারায় সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তি। যারা একসময় স্থায়ী গ্রামীণ জীবনের অংশ ছিল, তারা পরিণত হয় ‘উচ্ছিন্ন জনপদে’- যাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা থাকে না, থাকে কেবল অনিশ্চয়তার যাত্রা।

এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। কৃষিজীবী পরিবারগুলো তাদের ফসলি জমি হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। জমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও পরিচয়ের ভিত্তি। সেই ভিত্তি নদীতে বিলীন হয়ে গেলে তারা বাধ্য হয় বিকল্প জীবিকার সন্ধানে। অনেকেই শহরমুখী হয়, কিন্তু সেখানে তাদের স্থান হয় অস্থায়ী শ্রমিকের কাতারে, যেখানে জীবনযাপন নিরন্তর সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ।

শিশুদের জীবনে নদীভাঙন এক নিঃশব্দ বিপর্যয় ডেকে আনে। ঘন ঘন স্থানান্তরের কারণে তাদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, বিদ্যালয়ের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং অনেকেই অল্প বয়সে শ্রমজীবনে প্রবেশ করে। নারীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরো গভীর; তারা একদিকে গৃহহীনতার ভার বহন করে, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে নদীভাঙন কেবল ভৌগোলিক ক্ষয় নয়, এটি সামাজিক কাঠামোরও এক গভীর ক্ষত।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নদীভাঙনের প্রভাব অত্যন্ত বিস্তৃত। একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে শহরে জনসংখ্যার চাপ বাড়ে। ভাঙনকবলিত মানুষরা শহরে এসে নিম্নআয়ের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়, যা নগর জীবনে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। এইভাবে নদীভাঙন একটি স্থানীয় সমস্যা থেকে জাতীয় সংকটে রূপ নেয়।

প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও জিও ব্যাগ, কোথাও বাঁধ বা তীর সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হলেও নদীর গতিশীল প্রকৃতি অনেক সময় এসব ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলে। নদী যেন তার নিজস্ব নিয়মে প্রবাহিত হয়ে মানুষের তৈরি সীমারেখাকে বারবার অস্বীকার করে।

তবে সমস্যার গভীরে কেবল প্রকৃতি নয়, মানবসৃষ্ট কারণও বিদ্যমান। অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা, বালু উত্তোলন, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে নদীভাঙন এখন আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি মানবসভ্যতার অসাবধানতারও প্রতিচ্ছবি।

এই প্রেক্ষাপটে টেকসই সমাধানের প্রয়োজন অনিবার্য। নদীভাঙন রোধে কেবল সাময়িক প্রতিরক্ষা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। পাশাপাশি ভাঙনকবলিত মানুষের পুনর্বাসন, জীবিকা পুনর্গঠন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। নদীভাঙনের শিকার মানুষরা পরাজিত নয়; তারা প্রতিনিয়ত নতুন করে বাঁচার সংগ্রামে লিপ্ত। প্রতিবার ভাঙনের পর তারা আবার ঘর বাঁধে, আবার স্বপ্ন দেখে। এই অদম্য মানসিকতাই তাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এই শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বশীল সহায়তা অপরিহার্য।

নদী তাই একদিকে জীবনের উৎস, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার প্রতীক। তার ভাঙন-স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য জীবন, আবার সেই স্রোতের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে নতুন সংগ্রাম। এই দ্বন্দ্বময় বাস্তবতাই বাংলাদেশের নদীভাঙনকে কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডিতে রূপ দিয়েছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়