জাকির পারভেজ

  ১৯ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

চামড়াশিল্পের বেহাল দশা

চামড়াশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে মন ভারি হয়ে আসে। আমাদের দেশের উৎপাদিত চামড়ার ন্যায্যমূল্য আমরা পাই না। সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশি কোম্পানিগুলো চড়ামূল্যে বিক্রি করছে বিশ্ব বাজারে। আমরাই আবার তাদের অন্যতম ক্রেতা। বিষয়টা খুবই বেদনাদায়ক এবং একইসঙ্গে আশঙ্কার। আমাদের দেশে পশুর চামড়া সংগ্রহের প্রধান উৎস বা মৌসুম হলো ঈদুুল আজহার সময়। দেশব্যাপী ধর্মপ্রাণ মুসলমান সম্প্রদায় কোরবানি করে থাকে। ফলশ্রুতিতে বিপুল পরিমাণ কোরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। ইদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে তৈরি হয় কোটি-কোটি টাকার চামড়ার বাজার। একসময় বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত ছিল- চামড়াশিল্প। এখন চামড়া নষ্ট হয়, দাম পড়ে যায়, মাদরাসা ও এতিমখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরকম বিপুল সম্ভাবনাময় শিল্প, এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি।

প্রশ্ন জাগে, কেন এই সংকট?

বাংলাদেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত বলা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী-এ খাত থেকে বছরে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে। তথ্যটি খুবই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাতির নিচেই রয়েছে অন্ধকার। বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার আয় হারাচ্ছে। ইপিবির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী-২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি আয় ছিল ১২৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় ১১৪৫.০৭ মার্কিন ডলার। ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি প্রায় দেড় গুণের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমাদের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

সংকটের বর্তমান চিত্রে আমরা দেখছি- চামড়ার দামে ব্যাপক ধস। যার কারণে চামড়া সংরক্ষণে পশু কোরবানিদাতাদের তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়, ময়লার ভাগাড়ে হাবুডুবু খায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সম্পদ। মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর অন্যতম আয়ের খাত হলো- কোরবানি পশুর চামড়া। চামড়া ব্যবস্থাপনার এই বেহাল দশার কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে বিপাকে। দাননির্ভর এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের একটি আয়ের খাত প্রায় হারাতে বসেছে। যে চামড়া একসময় এতিমখানার প্রধান আয়ের উৎস ছিল, এখন তা বিক্রি করে পরিবহন খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়ে ফেলেছে। তারা এখন আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। ব্যাংক ঋণের পরিমাণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় অনেক ট্যানারি বসে গেছে। অনেকগুলো এরই মধ্যে বন্ধ অথবা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নীতিগত দুর্বলতাগুলো খাতটিকে পিছিয়ে রেখেছে। নব্বইয়ের দশক থেকেই হাজারীবাগের ভয়াবহ দূষণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। ট্যানারিগুলো সরানোর জন্য আদালত, পরিবেশবাদী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ছিল অনেক চাপ। অবশেষে, ২০০৩ সালে তৎকালীন সরকার চামড়া শিল্পনগরী ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৭ সালের মধ্যে এ প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়। এই স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল-পরিবেশ দূষণ কমানো ও আধুনিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ট্যানারি স্থানান্তরের পাশাপাশি দূষণটাও স্থানান্তরিত হয়েছে সাভারে। শুধু পার্থক্য এটুকুই যে, আগে চামড়াশিল্পের বর্জ্যে দূষিত হতো বুড়িগঙ্গা আর এখন দূষিত হয় ধলেশ্বরী নদী। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে সলিড ওয়েস্ট, ইটিপি স্লাজ ও ক্রোমিয়াম স্লাজ অন্যতম। এগুলোর নিরাপদ অপসারণের ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। ফলে, মাটি ও পানিদূষণের ঝুঁকি বেড়েছে। পরিবেশগত অবস্থাও আন্তর্জাতিকমান পূরণ করতে পারেনি। যার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো আন্তর্জাতিক ‘লেদার ওয়ার্র্কিং গ্রুপের (এলডব্লিওজি) সনদ পায়নি। ফলে, বড় আন্তর্জাতিক ব্রান্ডগুলো সরাসরি অর্ডার দিচ্ছে না। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রপ্তানি আয়।

২০০৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস ও টিম্বারল্যান্ডের মতো বৈশি^ক ব্রান্ড ও জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘এলডিব্লিওজি’ প্রতিষ্ঠিত করে। বর্তমানে এই সংস্থার অধীন বিশ্বের নামিদামি প্রায় ১ হাজার ব্রান্ড ও সরবরাহ খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সুতরাং এই সনদ ব্যতীত বিশ্ব বাজারে রপ্তানি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা প্রায় অসম্ভব। সনদবিহীন ট্যানারিগুলো প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া বিক্রি করে ৪৫ সেন্ট থেকে ১.৬ ডলারে। অন্যদিকে, সনদধারী ট্যানারিগুলো একই চামড়া বিক্রি করে দ্বিগুণেরও বেশি দামে। বাংলাদেশে শুধু ৮টি ট্যানারির ‘এলডিব্লিওজি’ সনদ রয়েছে। মজার বিষয় হলো- এই ট্যানারিগুলোর সবগুলোই ‘বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী, সাভার’ এলাকার বাইরে অবস্থিত। কোম্পানিগুলো নিজ উদ্যোগে ইটিপি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। তাহলে সমস্যা শুধু শিল্পনগরী এলাকার ট্যানারিগুলোতে। এখানে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ‘সিইটিপি’ করা হয়েছে। বাংলাদেশি ও চীনা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হলেও এর কার্যকারিতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ডিজাইন ত্রুটিপূর্ণ, নিম্নমানের ঢালাইসহ নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়। সিইটিপির ধারণক্ষমতা ১৪ হাজার ঘনমিটার, যেখানে আমাদের প্রয়োজন ২৫ হাজার ঘনমিটার। কোরবানির সময় ধারণক্ষমতার প্রয়োজন হয় প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার। আমাদের ১২ থেকে ১৫টি ট্যানারি সনদ পাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আটকে আছে। সনদপ্রাপ্তির জন্য মোট নম্বর ১৭১০ ধরা হয়। এর মধ্যে কারখানা সংশ্লিষ্ট বিষয় ১৪০০ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৩০০ নম্বর। কারখানার বিষয়গুলোতে তারা ভালো করেছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্য ট্যানারিগুলো ‘এলডব্লিওজি’ সনদ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

আমাদেরকে এখন আধা-প্রক্রিয়াজাত ‘ক্রাস্ট লেদার’ চীনের কাছে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। যে চামড়া আগে প্রতি বর্গফুট ১.৫ ডলারে বিক্রি হয়েছে। একই চামড়া এখন চীনের কাছে ৬০-৬৫ সেন্টে বিক্রি হচ্ছে। আবার বাংলাদেশের যেসব কোম্পানির সনদ রয়েছে, তারা ফিনিশড লেদার নিয়ে কাজ করতে পারে। কোম্পানিগুলো বছরে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের ফিনিশড লেদার আমদানি করে থাকে। আমাদের চামড়া আমরা কম দামে রপ্তানি করছি, আবার সেই চামড়া বিদেশে প্রক্রিয়াজাত হয়ে আমাদের নিকটে বেশি দামে আমদানি হচ্ছে। একদিকে যেমন আমাদের রপ্তানি আয় কমছে, অন্যদিকে ক্রমাগত বাড়ছে আমদানি ব্যয়।

এই শিল্পের আরেকটি বড় সংকট হলো-চামড়া সংগ্রহে সমন্বয়হীনতা। ২০২৫ সালে সিপিডির একটি জরিপে বলা হয়েছে- সে বছর পশু কোরবানি হয়েছে ৯১ লাখের বেশি। কিন্তু মোট চামড়া সংগ্রহের সংখ্যা ছিল-৫৭ লাখের কাছাকাছি। একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চামড়ার কোনো হদিস মেলে না। এই চামড়া অন্য কোনো দেশে পাচার হয় কিনা খতিয়ে দেখা দরকার। উপরন্তু অদক্ষ হাতে ছাড়ানো ও লবণছাড়া খোলা জায়গায় সংরক্ষণের জন্য চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়।

সরকার ‘চামড়া শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’, ২০ কোটি টাকার লবণ ও বিভিন্ন মনিটরিং সেল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১২৫০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এগুলো আপাতদৃষ্টে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সঠিকভাবে তদারকি করতে না পারলে সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়বে। আমার মনে হয়, চামড়াশিল্পের উন্নয়নের জন্য এখন সবার আগে ‘সিইটিপি’র প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শুধু এ কারণেই পুরো ইউরোপিয়ান বাজার আমরা ধরতে পারছি না।

লেখক : ইন্সট্রাক্টর (রসায়ন), ভেড়ামারা টিএসসি, কুষ্টিয়া

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়