আবু আফজাল সালেহ

  ১০ জুন, ২০২৬

বিশ্লেষণ

সৌরশক্তির ব্যবহার : বিশ্ব বনাম বাংলাদেশ

সৌরশক্তি হলো সূর্য থেকে প্রাপ্ত নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব শক্তি, যা বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিভিন্ন কাজে লাগানো। বলে রাখা ভালো, সৌরশক্তি একটি নবায়নযোগ্য উৎস, যা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। এ-শক্তি বিদ্যুৎ বিল কমায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুবই কম। পরিবেশ দূষণমুক্ত (কার্বন নিঃসরণ নেই)। গ্রামীণ এলাকায় যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে নির্ভরযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে সৌরশক্তিকে কাজে লাগানো উত্তম বিকল্প হতে পারে।

সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বাসাবাড়ি, অফিস ও শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডেও দেওয়া যায়। ডিজেল বা বিদ্যুৎ চালিত পা¤েপর পরিবর্তে সৌরশক্তি-চালিত সেচ পা¤প ব্যবহার করে কৃষি কাজ করা বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে। সোলার কুকার ব্যবহার করে রান্না, রাস্তাঘাট, পার্ক বা গ্রামীণ এলাকায় সোলার স্ট্রিট

লাইট ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হয়। সৌরচালিত গাড়ি, নৌকা ও চার্জিং স্টেশন তৈরিতে সৌরশক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়ে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিল কমাতে সাহায্য করে। বৃহৎখাতের সৌরশক্তির ব্যবহার বিস্তৃতি ও আরো আন্তরিক হতে হবে।

সৌরশক্তি খাতে চীনের আধিপত্য রয়েছে; দেশটি বিশ্বের ৭৭.৮ শতাংশ সোলার প্যানেল উৎপাদন করে এবং ২০২২ সালে এর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩৯৩ গিগাওয়াট। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)-এর মতে, ২০২৩ সালে চীন ২০২২ সালে বাকি সমগ্র বিশ্বের চেয়েও বেশি সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে। ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই আসবে চীনে, এবং দেশটি তার ২০৩০ সালের সৌর লক্ষ্যমাত্রা ছয় বছর আগেই, অর্থাৎ ২০২৪ সালেই অর্জন করার পথে রয়েছে। ১৫.৬ শতাংশ সোরশক্তির বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা এশিয়ার বাইরে বৃহত্তম সৌরশক্তি উৎপাদনকারী এবং সামগ্রিকভাবে বিদ্যুতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোক্তা। ২০২২ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১৩ গিগাওয়াটেরও বেশি সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা স্থাপিত হয়েছিল-যা জাপানের সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় দেড় গুণ। ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৭ লক্ষ সোলার পিভি স্থাপনের মাধ্যমে সৌরশক্তির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ১৬১ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। যা দেশের মোট বিদ্যুতের ৩.৯ শতাংশ সরবরাহ করে। ২০২৮ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ৩৭৭ গিগাওয়াটে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করছে। জাপান বিশ্বের তৃতীয় ৭.৭ শতাংশ (৮৩ গিগাওয়াটেরও বেশি), ৪র্থ স্থানে ভারত ৭.২ শতাংশ (৬৩ গিগাওয়াটেরও বেশি), জার্মানি (৪.৬ শতাংশ), অষ্ট্রেলিয়া ২.৯ শতাংশ, ¯েপন ২.৬ শতাংশ, ব্রাজিল ২.৩ শতাংশ, ইতালি ২.১ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। সৌরশক্তি থেকে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারে

এর পরের দেশগুলো হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ও মেক্সিকো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাসা ১৯৯৭ সাল থেকে unmanned aerial vehicles (UAVs) এর প্রযুক্তির জন্য সৌরশক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাণিজ্যিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অষ্ট্রেলিয়াতেও সৌরশক্তির ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় সানপাওয়ার প্যানেলগুলো উন্নত আইবিসি সেল ব্যবহার করে, যা উচ্চ মডিউল দক্ষতার জন্য স্বীকৃত। রাশিয়া, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর কিংবা ভারত-পাকিস্তানও সৌরশক্তির ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে জীবাশ্মশক্তি এবং কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। জানুয়ারি-২০২৬ যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক থিংক ট্যাংক ‘এম্বার’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদ্যুতের প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে কয়লাকে ছাড়িয়ে গেছে সৌরশক্তি। বলে রাখা ভালো, ইইউতে সবচেয়ে দ্রুতবর্ধমান বিদ্যুতের উৎস হয়ে উঠেছে সৌরশক্তি। অঞ্চলটিতে এরই মধ্যে ১১ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে পরিবেশবান্ধব এই উৎস থেকে। বর্তমানে সেখানে সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুতের চাহিদার ৪৭ শতাংশ উৎপাদন করা হচ্ছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৩৪ শতাংশের মতো। সামগ্রিকভাবে ইইউতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমেছে প্রায় ২৯ শতাংশ আর কয়লার ব্যবহার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ শতাংশে। নতুন বায়ু ও সৌরশক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৯ সাল থেকে প্রায় ৬ হাজার ১০০ কোটি ডলার মূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি এড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সহজলভ্য ও কম খরচ। বাংলাদেশের পার্বত্য, হাওর কিংবা চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার অর্থনীতির সম্ভাবনাকে শক্ত করছে। সরকারও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরশক্তির ব্যবহার অর্থনীতি ও বিকাশমান সভ্যততার শ্রী-বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। পাহাড়ি জনপদের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকার বসতিগুলোতে সেখানে সোলার প্যানেল বসিয়ে আলোকিত করা হচ্ছে। সৌরশক্তি পরিবেশ দূষণ করে না, যা পাহাড়ি ও চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। প্রচুর সূর্যালোক থাকায় এসব অঞ্চলে সৌরশক্তি উৎপাদন ও ব্যবহার খুবই কার্যকরী একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশে, বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়, সৌরশক্তি কেবল বিদ্যুৎই দিচ্ছে না, বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ আমাদেরকে অনেক ভুগিয়েছে। বর্তমানে ইসরাইল-আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ আরো ভয়াবহ করে তুলছে। তেল নিয়ে প্রতিনিয়তই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে, বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। কৃষি ও শিল্পখাত চরম হুমকির মধ্যে পড়ছে এবং আরো ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়বে। সরকার ব্যাটারিচালিত যানবাহনে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে। কৃষি ও যানবাহন খাতে শক্তির প্রধান বিকল্প হবে সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে শক্তিতে রূপান্তর করা। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যহার কমিয়ে দিয়ে পাবলিক যানবাহন ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও এ সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। জালানি-তেল ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে হবে। অফিস-আদালতে এসির ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। ই-বাইক কিংবা বাইসাইকেল ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সাইকেল লেন চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। এ উদ্যোগ কার্যকরি একটি সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সৌরশক্তির পাশাপাশি নদী ও সমুদ্রকে শক্তির উৎস/রূপান্তরক হিসাবে ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি ভবনের ছাদে সৌরশক্তির রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরো বিস্তৃতি ও বাধ্যতামূলক ব্যবহারে কঠোর হতে হবে। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদী ফল দিবে। এ বিষয়ে গুরুত্ব কম দিলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়