ন্যাশনাল গ্রিন মিশন
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার যুগান্তকারী পদক্ষেপ

বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর লাখো লাখো গাছের চারা রোপণ করা হয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব গাছ টিকে থাকে না। গাছ লাগানো সহজ হলেও তা বড় করে তোলা কঠিন। বেশিরভাগ প্রকল্পে ভুল প্রজাতি নির্বাচন, পরিচর্যার অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। ফলে কাগজে-কলমে সাফল্য থাকলেও প্রকৃত পরিবেশে কোনো পরিবর্তন আসে না। এবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ন্যাশনাল গ্রিন মিশন শুরু করেছে সরকার। আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মেগা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। গত শনিবার কক্সবাজারে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির প্রকৃতি এবং ধরন বিবেচনায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হবে। সরকারের প্রত্যাশা সবুজে ছেয়ে যাবে দেশ।
বলা সংগত, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণকে শুধু সংখ্যার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে হবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসম্পৃক্ততা। কোন অঞ্চলে কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে, সে বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা করতে হবে। দেশীয় প্রজাতির গাছ; বিশেষ করে ফলদ গাছকে অগ্রাধিকার দিলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে, পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে। পরিবেশবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, তা দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এরই মধ্যে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে আসছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩ হাজার ৭২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার, ৪ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার এবং বসতবাড়ি বনায়নে ৫৬ লাখ চারা রোপণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে যেসব বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে সেই সব পরিসংখ্যান যদি আমরা দেখি, তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট হবে যে এ পর্যন্ত কত শতাংশ গাছ টিকে আছে। এক্ষেত্রে বড় প্রমাণ হলো, দেশে বনভূমি বাড়েনি। গ্রামীণ বনও কমছে, রাস্তার ধারে কিছু গাছপালা লাগানো হয়েছে, তবে তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এমনকি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় লাগানো গাছগুলোর অনেক গাছই স্থানীয় অংশগ্রহণকারী উপকারভোগীদের উপযুক্ত পরিচর্যা ও সুরক্ষা না পেয়ে মরে গেছে অথবা লোভের কারণে ধ্বংস হয়েছে। তাই কোনো এলাকায় গাছ লাগানোর আগে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি কার্যকর সমীক্ষার কাজ মাঠে নামার আগে করতে হবে। দেখতে হবে দেশের কোন অঞ্চলের কোথায় বর্তমানে কতটুকু বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা এবং কী কী গাছপালা রয়েছে, তার একটি সমীক্ষা। যার মাধ্যমে দেখতে কোন কোন গাছ কোন কোন স্থানের জন্য উপযুক্ত। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য যেসব গাছ ভালো, সেগুলোকে তালিকায় রাখতে হবে। বৃক্ষরোপণে সংখ্যার চেয়ে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, সবকার এসব বিষয়গুলোকে অবশ্যই গুরুত্ব দিবে। দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
"





































