মাসুম বিল্লাহ

  ৪ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

ভিনদেশী পতাকায় ভালোবাসার ক্যানভাস আবেগ, নাকি অপচয়ের সংস্কৃতি?

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এবং দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘Sport has the power to change the world.’ খেলাধুলা পৃথিবী বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে কিন্তু সেই আবেগ যখন নিজের জাতীয় পরিচয়কে আড়াল করে ভিনদেশী পতাকার অন্ধ প্রতিযোগিতায় রূপ নেয় তখন তা নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। যা নিয়ে নিয়ে চলে নানাবিধ জল্পনাকল্পনা। বছর ঘুরে ঘুরে ফুটবল বিশ্বকাপ আসলেই রংবেরঙের পতাকার উন্মাদনায় মেতে ওঠে বাংলাদেশের আপামর জনতা। ফুটবল বিশ্বকাপ কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর এলেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেন এক নতুন রূপ ধারণ করে। গ্রামের মাঠ, শহরের অলিগলি, বাড়ির ছাদ, রাস্তার মোড়, এমনকি ধানক্ষেতের পাশেও উড়তে থাকে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা অন্য কোনো দেশের পতাকা। সমর্থনের এই চিত্র নতুন নয়। বহু দশক ধরেই বাংলাদেশে বিদেশি ফুটবল দলের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা এবং সমর্থনের এক অনন্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। কোথাও কয়েক হাজার ফুট দীর্ঘ পতাকা তৈরি হচ্ছে, কোথাও লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদেশি দেশের পতাকা টানানো হচ্ছে, আবার কোথাও সমর্থকদের মধ্যে মর্যাদার লড়াইয়ে পতাকার দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা হয়ে উঠছে অহংকারের বিষয়।

প্রশ্ন হলো, এই প্রবণতা কি কেবল খেলার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এটি ধীরে ধীরে অপচয়ের এক সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে? আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই প্রবণতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী ধরনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে?

ক্রীড়াপ্রেম মানবিক অনুভূতিরই একটি অংশ। মানুষ তার পছন্দের দলকে সমর্থন করবে, জয়-পরাজয়ে আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেবে, সেটিই স্বাভাবিক। খেলাধুলা জাতি, ধর্ম, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। ফলে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আবেগকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না। বরং এটি বৈশ্বিক ক্রীড়া সংস্কৃতিরই একটি অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সমর্থন যুক্তিবোধকে ছাড়িয়ে সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং অর্থের অপচয়ের দিকে ধাবিত হয়।

প্রতিবছর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়, যেখানে দেখা যায় কেউ গবাদিপশু বিক্রি করে, কেউ জমি বন্ধক রেখে, কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ আবার ঋণ নিয়ে বিদেশি দলের পতাকা তৈরি বা টাঙানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। অনেক স্থানে উচু স্থানে পতাকা টানাতে গিয়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনা সবসময় ব্যাপক না হলেও বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে থাকে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দ্রুত আলোচনায় আসে। বাস্তবতা হলো, যে দেশে এখনো অনেক পরিবার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছে, সেখানে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে বিদেশি দেশের পতাকা তৈরির প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এখানে বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক মনস্তত্ত্বেরও একটি প্রশ্ন। কেন একজন ব্যক্তি নিজের দেশের নয়, হাজার মাইল দূরের একটি দেশের পতাকা নিয়ে এমন আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন যে, তা তার আর্থিক সামর্থ্যকেও অতিক্রম করে? এর পেছনে রয়েছে বিশ্বায়নের প্রভাব, গণমাধ্যমের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার বিপুল জনপ্রিয়তা। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আত্মপরিচয় ও জাতীয় চেতনা সম্পর্কেও কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে।

বাংলাদেশের মানুষ বিদেশি দলকে সমর্থন করতেই পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যখন বিদেশি পতাকা আমাদের নিজস্ব জাতীয় পতাকার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন তা চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। জাতীয় পতাকা একটি দেশের স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ, ইতিহাস ও অস্তিত্বের প্রতীক। অথচ বিশ্বকাপের মৌসুমে অনেক এলাকায় বিদেশি পতাকার বাহার চোখে পড়লেও জাতীয় পতাকা দেখা যায় না বললেই চলে। এতে নতুন প্রজন্মের কাছে কী বার্তা যায়? তারা কি শিখছে যে জাতীয় পরিচয়ের চেয়ে বিদেশি দলের প্রতি আবেগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

একটি জাতির শক্তি তার আত্মপরিচয়বোধে। যে জাতি নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে যথাযথ মর্যাদা দিতে পারে না, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগে। বিদেশি দলকে সমর্থন করা এবং বিদেশি পতাকাকে জাতীয় পরিচয়ের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা এক বিষয় নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় আমরা এই দুইয়ের পার্থক্য ভুলে যাই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক প্রতিযোগিতার মনোভাব। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসার জন্য কিংবা ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেকেই বিশাল আকারের পতাকা তৈরির উদ্যোগ নেন। কে বড় পতাকা বানাবে, কার পতাকা বেশি উঁচুতে উড়বে, কার আয়োজন বেশি আলোচিত হবে, তা নিয়ে এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতা ক্রীড়াপ্রেমের চেয়ে আত্মপ্রচারের সংস্কৃতিকেই বেশি উৎসাহিত করে।

অন্যদিকে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব দৃশ্য দেখে বড় হচ্ছে। তারা দেখছে, একটি বিদেশি দেশের পতাকা নিয়ে মানুষ হাজার হাজার টাকা ব্যয় করছে, দিনরাত আলোচনা করছে, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক বানিয়ে ফেলছে। কিন্তু একইসঙ্গে তারা কি দেখছে শিক্ষা, গবেষণা, বইপড়া, বিজ্ঞানচর্চা বা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড নিয়ে এমন উৎসাহ? যদি না দেখে, তাহলে তাদের কাছে অগ্রাধিকারের বার্তাটি কীভাবে পৌঁছাবে?

একটি সমাজে কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়, তা পরবর্তী প্রজন্মের মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। যদি আমরা প্রদর্শনমূলক আবেগকে উৎসাহিত করি, তাহলে তারাও সেই পথেই হাঁটবে। কিন্তু যদি আমরা খেলাধুলার আনন্দের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বকে গুরুত্ব দিই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেদিকেই আগ্রহী হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। বিশ্বকাপ বা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর মানুষের মধ্যে আনন্দ, সম্প্রীতি ও উৎসবের আবহ তৈরি করে। এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু সেই আনন্দ যেন অপচয়, বিভাজন কিংবা অযৌক্তিক প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। সমর্থনের সংস্কৃতি হতে হবে পরিমিত, মার্জিত ও সচেতন। একটি পতাকা টানানো কিংবা প্রিয় দলের জার্সি পরা এক বিষয়; কিন্তু নিজের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

আমরা প্রায়ই উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ টানি। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, উন্নত ক্রীড়া সংস্কৃতির দেশগুলোতে সমর্থন আবেগের বিষয় হলেও তা সাধারণত ব্যক্তি বা সমাজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। সেখানে খেলাধুলা বিনোদন, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংযোগের মাধ্যম। কিন্তু আমাদের সমাজে কখনো কখনো এটি প্রদর্শনমূলক প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, যা সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।

সমর্থন থাকুক, আনন্দ থাকুক, উৎসব থাকুক। কিন্তু সেই সঙ্গে থাকুক দায়িত্ববোধও। বিদেশি দলকে ভালোবাসার অধিকার সবার আছে, তবে সেই ভালোবাসা যেন আত্মপরিচয়কে আড়াল না করে। পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা থাকুক, তবে নিজের জাতীয় পতাকার মর্যাদা যেন কখনো ম্লান না হয়। বিশ্বকাপের উন্মাদনা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জাতীয় পরিচয় স্থায়ী।

অতএব, ভিনদেশী পতাকায় ভালোবাসার ক্যানভাস আঁকতেই পারে মানুষ। কিন্তু সেই ক্যানভাস যদি অপচয়, আত্মবিস্মৃতি কিংবা অন্ধ প্রতিযোগিতার প্রতীক হয়ে ওঠে তাহলে তা অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। আজ প্রয়োজন আবেগকে অস্বীকার করা নয় বরং আবেগকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিচালিত করা। কারণ একটি জাতির পরিপক্বতা প্রকাশ পায় তার উচ্ছ্বাসে নয়, বরং উচ্ছ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে হবে যে, খেলা ভালোবাসা যায়, বিদেশি দলকে সমর্থন করা যায়, কিন্তু নিজের পরিচয়, মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো আবেগকে স্থান দেওয়া যায় না। এটাই হবে সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতি এবং সচেতন নাগরিক সমাজ গঠনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি পতাকার যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়, তা কি শুধুই খেলার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, নাকি এটি ধীরে ধীরে অপচয় ও আত্মবিস্মৃতির এক সংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়