ড. শহীদুল ইসলাম
বিশ্লেষণ
প্রাকৃতিক খাদ্য রং শিল্পের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে কৃষি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলা থেকে শুরু করে আজকের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে দেশের কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে শুধুমাত্র কৃষিপণ্য উৎপাদন যথেষ্ট নয়; বরং সেই কৃষিপণ্যকে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে রূপান্তর করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি। যে দেশ কাঁচামাল বিক্রি করে, সে সীমিত আয় করে; আর যে দেশ সেই কাঁচামালকে প্রযুক্তি, গবেষণা এবং শিল্পের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন করে বিশ্ববাজারে বিক্রি করে, সে দেশই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশের সামনে আজ এমনই একটি নতুন সম্ভাবনার নাম প্রাকৃতিক খাদ্য রং শিল্প।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য শিল্পে গত দুই দশকে একটি নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এক সময় খাদ্যপণ্যের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য ব্যাপকভাবে কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হতো। উৎপাদন খরচ কম, রঙের স্থায়িত্ব বেশি এবং সহজলভ্য হওয়ায় এসব রং খাদ্য শিল্পে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন গবেষণা এবং ভোক্তা সচেতনতার কারণে অনেক দেশ কৃত্রিম রং ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে শুরু করে। শিশুদের খাদ্য, পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে কিছু কৃত্রিম রং নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। এর ফলেই আন্তর্জাতিক খাদ্য কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক রঙের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।
আজ বিশ্বের সুপারমার্কেটগুলোতে গেলে দেখা যায়, খাদ্যপণ্যের মোড়কে বড় অক্ষরে লেখা থাকে ‘Naturally Colored', 'No Artificial Colors', 'Plant-Based Ingredients’ অথবা ‘Clean Label Product’। এই পরিবর্তন কেবল একটি বিপণন কৌশল নয়; বরং ভোক্তার পছন্দের মৌলিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদানের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক খাদ্য রঙের বাজারও প্রতি বছর সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন একটি বিরল সুযোগ। কারণ বিশ্বের অনেক দেশকে প্রাকৃতিক রঙের কাঁচামাল আমদানি করতে হয়, কিন্তু বাংলাদেশ নিজেই এই কাঁচামাল উৎপাদন করতে সক্ষম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত হলুদ, বিটরুট, লালশাক, অপরাজিতা ফুল, সজিনা পাতা এবং গাঁদা ফুল থেকে খাদ্য শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী প্রাকৃতিক রং উৎপাদন করা যায়। এর মধ্যে কিছু ফসল ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে, আবার কিছু ফসল প্রায় অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এগুলোকে একটি নতুন শিল্পখাতের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
হলুদ বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি মসলা নয়, বরং একটি ঐতিহ্য। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে হলুদ উৎপাদিত হয়। হলুদের প্রধান রঞ্জক উপাদান কারকিউমিন, যা উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ প্রদান করে। আন্তর্জাতিক খাদ্য শিল্পে এটি সস, স্ন্যাকস, দুগ্ধজাত পণ্য, বেকারি পণ্য এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে হলুদ নির্যাস উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ হলুদ এখনো কাঁচা বা সাধারণ গুঁড়া হিসেবে বাজারজাত হয়।
বিটরুট প্রাকৃতিক লাল রঙের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিটরুটে থাকা বেটানিন খাদ্য শিল্পে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি প্রাকৃতিক রঞ্জক। আইসক্রিম, জুস, কনফেকশনারি, দই এবং স্বাস্থ্যকর পানীয়তে বিটরুটভিত্তিক রং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিটরুট চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই শিল্পের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
তবে বাংলাদেশের জন্য আরো বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে লালশাকে। লালশাক এমন একটি ফসল যা দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় উৎপাদিত হয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। লালশাকে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন ও বেটাসায়ানিন প্রাকৃতিক লাল, গোলাপি এবং বেগুনি রঙের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বিটরুটের তুলনায় লালশাকের দাম কম, উৎপাদন সহজ এবং সরবরাহও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে ভবিষ্যতে ‘বাংলাদেশি রেড অ্যামারাš ’এক্সট্রাক্ট’ আন্তর্জাতিক বাজারে একটি স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারে।
নীল রঙের ক্ষেত্রে অপরাজিতা ফুল বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ সম্পদ। প্রকৃতিতে নীল রঙের উৎস খুবই সীমিত। অপরাজিতা ফুলের অ্যান্থোসায়ানিন নির্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক নীল রঙ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক স্বাস্থ্যকর পানীয়, চা, ডেজার্ট এবং বিশেষ খাদ্যপণ্যে এটি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে এই ফুল প্রায় সর্বত্র জন্মে এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষ করাও সহজ।
সবুজ রঙের জন্য সজিনা বা মরিঙ্গা পাতা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মরিঙ্গা শুধু একটি রঙের উৎস নয়, বরং পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সুপারফুড। এর পাউডার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয়। ফলে মরিঙ্গা-ভিত্তিক প্রাকৃতিক রঙের পাশাপাশি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান হিসেবেও বাজার তৈরি করা সম্ভব।
গাঁদা ফুলও বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল। গাঁদা ফুলে লুটেইন ও ক্যারোটিনয়েড জাতীয় উপাদান থাকে, যা কমলা-হলুদ রং উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গাঁদা ফুলের নির্যাস খাদ্য, পোল্ট্রি এবং নিউট্রাসিউটিক্যাল শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রাকৃতিক খাদ্য রং উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান পণ্য তৈরি করা যায়- পাউডার এবং লিকুইড। পাউডার উৎপাদনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। কাঁচামাল সংগ্রহ, বাছাই, ধোয়া, কাটা, শুকানো, গুঁড়া করা, চালুনি করা এবং প্যাকেটজাতকরণের মাধ্যমে পাউডার উৎপাদন করা হয়। অন্যদিকে লিকুইড রঙের ক্ষেত্রে নির্যাস আহরণ, ফিল্টারিং, ঘনীভবন, পাস্তুরাইজেশন এবং বোতলজাতকরণ প্রয়োজন হয়।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ কেজি প্রতি ঘণ্টা উৎপাদন ক্ষমতার একটি ইউনিট দিয়ে শুরু করা সবচেয়ে যৌক্তিক। এই ইউনিট দিনে ৮ ঘণ্টা পরিচালনা করলে ১৬০ কেজি এবং মাসে প্রায় ৪,০০০ কেজি পণ্য উৎপাদন করতে পারে। এর জন্য আনুমানিক ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগের মধ্যে যন্ত্রপাতি, স্থাপন ব্যয়, বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রাথমিক ল্যাব সুবিধা এবং কার্যকরী মূলধন অন্তর্ভুক্ত।
বাজার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১০০ কেজি প্রতি ঘণ্টা উৎপাদন ক্ষমতার একটি বাণিজ্যিক ইউনিট স্থাপন করা যেতে পারে। এই ইউনিট মাসে প্রায় ২০,০০০ কেজি পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম। এই পর্যায়ে HACCP, ISO ২২০০০, GMP এবং হালাল সার্টিফিকেশনের মতো আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে। কারণ এই পর্যায়ের লক্ষ্য হবে শুধু দেশীয় বাজার নয়, বরং রপ্তানি বাজারও।
লিকুইড কালারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ১০০ লিটার বিটরুট বা লালশাকভিত্তিক লিকুইড কালার উৎপাদনের মোট ব্যয় আনুমানিক ২০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি লিটার উৎপাদন খরচ ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অন্যদিকে বাজারে এই পণ্য ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। ফলে উদ্যোক্তা একটি উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করতে পারেন।
এই শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি কৃষি ও শিল্পের মধ্যে একটি সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। কৃষক কাঁচামাল উৎপাদন করবেন, শিল্প প্রতিষ্ঠান তা প্রক্রিয়াজাত করবে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করবে। এর ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্য শৃঙ্খল তৈরি হবে, যেখানে কৃষক, উদ্যোক্তা, শ্রমিক এবং রপ্তানিকারক- সবাই উপকৃত হবেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে নতুন রপ্তানি খাতের সন্ধান করছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য রপ্তানি আগামী দিনের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রাকৃতিক খাদ্য রং শিল্প সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ। তুলনামূলক কম বিনিয়োগ, সহজলভ্য কাঁচামাল, উচ্চ মূল্য সংযোজন, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা এবং শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক ভিত্তি- সবকিছুমিলিয়ে এই শিল্প আগামী দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
হয়তো খুব শিগগিরই বাংলাদেশের কোনো গ্রামের কৃষকের উৎপাদিত লালশাক, হলুদ বা অপরাজিতা ফুল থেকে তৈরি প্রাকৃতিক রং ইউরোপের কোনো খাদ্য কারখানায় ব্যবহার হবে। হয়তো ‘বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাদ্য রং’ একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে একটি স্বীকৃত ব্র্যান্ডে পরিণত হবে। সেই সম্ভাবনা আজ আর কল্পনা নয়; সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং উদ্যোগের মাধ্যমে এটি একটি বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত হতে পারে। (Note: প্রাকৃতিক খাদ্য রং শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিনিয়োগ সম্ভাবনা বা এ-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে পরামর্শ, মতবিনিময় অথবা তথ্য জানতে আগ্রহী হলে অনুগ্রহ করে ই-মেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।)
লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, ইউকে
"





































