মো. আদিল আহনাফ

  ৮ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সামনে বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি। কিন্তু গত এক দশকে এই ভিত্তির ওপর নেমে এসেছে এক অদৃশ্য ফাটল। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরমুখী হয়ে ওঠার যে জোয়ার তৈরি হয়েছে, তা কেবল মানুষের স্থান পরিবর্তন নয়, এটি দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে শ্রমিকের অভাব বা ‘কৃষক সংকট’ এখন একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং শ্রমশক্তি জরিপের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির হার গত দুই দশকে ৫২ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই হার হ্রাস পাওয়ার কারণ কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি নয়, বরং কৃষি খাতের প্রতি কৃষকের এবং তরুণ প্রজন্মের ‘বিমুখতা’।

জরিপে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে ৫ লাখ কর্মক্ষম মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, যাদের সিংহভাগই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি। এই বয়সের জনমিতিক লভ্যাংশ কৃষিতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা এখন শহরের বস্তিতে সস্তা শ্রমের জোগান দিচ্ছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে বিশাল আকারে কৃষক সংকট দেখা দিচ্ছে। এই কৃষক সংকটের ফলে কৃষি খাত আজ এক ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা উৎপাদন খরচজনিত মুদ্রাস্ফীতির কবলে। যেমন, ধান রোপণ বা ফসল কাটার মৌসুমে একজন কৃষকের মজুরি বিগত তিন বছরে ৪০০ টাকা থেকে ৮০০-১০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি। বর্ষার সময়ে এই মজুরি বৃদ্ধির হার আরো বেশি। এতে করে হেক্টর প্রতি উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ। শুধু তাই নয়, কৃষক পাওয়া যেন এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কৃষি খাতে কৃষকের অংশগ্রহণ গত পাঁচ বছরে প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। ফলে কৃষকের অভাবে জমির পরিচর্যা সঠিক সময়ে হচ্ছে না। ধান রোপণ ও কাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্যাপ্ত কৃষক না থাকায় প্রতি বছর প্রায় ১৫ শতাংশ ফসল মাঠেই নষ্ট হচ্ছে। গাণিতিক হিসেবে, এই ১৫ শতাংশ ফসল নষ্ট হওয়া মানে বছরে প্রায় ১০-১২ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ জাতীয় সম্পদের অপচয়। কৃষকের অভাবে ধান ছাড়াও বাকি ফসলগুলো এখন বিলুপ্ত প্রায় যেমন; পাট, গম, ভুট্রা, বিভিন্ন ধরনের কলাই ইত্যাদি।

কৃষক ও তরুণেরা শহরগামী হয়ে গ্রামে এখন যারা থাকছেন, তারা মূলত প্রবীণ কৃষক। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ কৃষকদের গড় বয়স বর্তমানে ৫০ বছরের উপরে। নবীন প্রজন্মের অনুপস্থিতিতে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ ও উচ্চমূল্যের ফসল ফলানোর সক্ষমতা গ্রাম হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে- বাংলাদেশে মোট আবাদি জমির প্রায় ১০-১২ শতাংশ বর্তমানে চাষের আওতার বাইরে চলে গেছে, কারণ এগুলো চাষ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা বা পর্যাপ্ত লোকবল নেই। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ফসল উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দরিদ্র কৃষকরা ঋণের জালে আটকা পড়ছে। এক পর্যায়ে তারা জমি লিজ দিতে বা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে, অথবা কৃষিকাজ ছেড়ে বিকল্প কোনো চিন্তা করছে। যার ফলে কৃষির নিয়ন্ত্রণ কৃষকের হাত থেকে চলে যাচ্ছে কর্পোরেট সিন্ডিকেটের হাতে। যার ফলে কৃষি পণ্যের দাম হয়ে উঠছে আকাশচুম্বী।

এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পরার হুমকি রয়েছে। দেশে প্রচলিত যে ‘কৃষি সহায়তা’ প্রকল্প চালু আছে তা দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন। যেমন, কৃষিকে যন্ত্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করতে হবে। কৃষিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার (ধান রোপণ যন্ত্র) ও কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। বর্তমান ভাড়ার ওপর বিশাল ভর্তুকি দিয়ে হলেও এটিকে সুলভ করতে হবে। কৃষিকে আধুনিক স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যেখানে কৃষকরা সরাসরি বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। প্রতিটি জেলায় ‘এগ্রো-প্রসেসিং জোন’ তৈরি করতে হবে। এতে করে গ্রামে বসেই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। ফলে, তরুণদের শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। কৃষককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার অধীনে এনে সরকারি পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করলে কৃষক পেশাটি আবার মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখন সময় কৃষিকে ‘গ্ল্যামারাস’ ও লাভজনক করার, যাতে আগামী প্রজন্মের কাছে ‘কৃষক’ শব্দটি সম্মানের ও সফলতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

মনে রাখতে হবে গ্রামের কৃষক যদি মাঠ ছাড়ে, তবে শহরের পাতে ভাত জুটবে না; এই সত্যটি আমাদের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত অনুধাবন করতে হবে। গ্রাম থেকে কৃষকের এই শহরায়ন কেবল একটি সামাজিক ঘটনা নয়, এটি একটি ‘সাইলেন্ট ইকোনমিক স্যাবোটাজ’ বা নীরব অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত হয়ে উঠেছে। কৃষি শ্রমিকের এই শূন্যতা কেবল সস্তা শ্রম দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়, বরং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে বহুমুখী করার মাধ্যমেই সম্ভব। কৃষক ধরে রাখা মানে শুধুমাত্র কৃষি বাঁচানো নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ আগামীর বাংলাদেশ নিশ্চিত করা।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়