অলোক আচার্য
দৃষ্টিপাত
গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি এজেন্ট ব্যাংকিং

এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করার অন্যতম ভরসার নাম। গ্রামীণ অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার অর্থ হলো অর্থনৈতিক সিস্টেমের ওপর আঘাত। গ্রামীণ কর্মসংস্থানই মূলত কর্মসংস্থানের বড়ো অংশ পূরণ করছে। মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং যুদ্ধের কারণে ঝিমিয়ে পরা গ্রামীণ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিই মূলত সার্বিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দেশের সিংহভাগ এলাকা গ্রামীণ জনোগোষ্ঠীর হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীর ওপর দেশের সার্বিক অর্থনীতির বাঁচা-মরা নির্ভর করে। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান, কৃষি ও বাজারজাতকরণ এবং চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য ঠিক থাকলেই অর্থনীতির আবহাওয়া ভালো থাকে। গ্রামেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অন্যতম উদাহরণ এজেন্ট ব্যাংকিং। এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণাটি খুব নতুন নয়। এখন গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে পরিচিত। এটা সম্ভব হয়েছে ব্যাংকিং এর মূল ধারণাকে এজেন্টের মাধ্যমে যখন বিস্তৃত করা গেছে। খুব সহজে, গ্রাহক যদি দূরত্ব, সঙ্কুলতা বা অন্য কোনো কারণে ব্যাংকের শাখাগুলোতে পৌঁছাতে না পারেন, ব্যাংককেই তখন গ্রাহকের সীমার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসাসেবা অথবা অন্য সেবার মতোই এটি গ্রাহকের খুব কাছে থাকে। ফলে লেনদেন আরো দ্রুত এবং গ্রাহকের হয়রানি ছাড়াই শেষ হয়। এতে যে গ্রাহক সন্তুষ্ট হবে বলাই বাহুল্য। এই ব্যাংকিং মডেলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- কোনো একটি ব্যাংক চুক্তির মাধ্যমে এজেন্ট নিয়োগ দেবে, যিনি ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রাহকদের আর্থিক সেবা দিয়ে যাবেন। এই পদ্ধতিতে লেনদেন হয় অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে, যেখানে গ্রাহক ও এজেন্ট বায়োমেট্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের লেনদেন নিশ্চিত করেন। পরে এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহককে অবহিত করা হয়। গত কয়েক বছরে গ্রামীণ অর্থনীতি টার্ন করেছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দিকে। এটি ব্যাপকভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পরার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের সুবিধাদি পৌঁছে গেছে হাতের মুঠোয়। ব্যাংকিং বিষয়টা এখন গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হাতের কাছে পাচ্ছে। নিজ এলাকাতেই হিসাব খোলা, নগদ জমা ও উত্তোলন, ব্যালেন্স অনুসন্ধান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ ও রেমিট্যান্স গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় সব সেবা পাচ্ছেন। আর গ্রামের কৃষক, মজুর থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় আসছেন। একইসঙ্গে শ্রম ও খরচ দুই-ই সাশ্রয় হচ্ছে। যদিও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের যাত্রা খুব বেশি বছরের নয়।
মাত্র এক যুগের কিছু বেশি সময় আগে থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দারুণ অগ্রগতিই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ বলে দেয়। ২০১৩ সালে ইউএনডিপির সহায়তায় বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ শুরু হয়। ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন পায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এরপর ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা জারির কিছু দিনের মধ্যে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। যে কারণে দিনটি এখন এজেন্ট ব্যাংকিং দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার জৈনসার ইউনিয়নে প্রথম এজেন্ট আউটলেট খোলা হয়। এরপর আর এই খাতে পিছনে তাকাতে হয়নি। ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ায় অন্য প্রায় সব ব্যাংকই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সুবিধা চালু করতে আরম্ভ করে। বাড়তে থাকে শাখা। ছড়িয়ে পরতে থাকে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে অসংখ্য শিক্ষিত উদ্যমী নারী-পুরুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এই আমানত প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক অগ্রগতিরই প্রতিফলন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় আমানত বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ গত ডিসেম্বরে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। প্রায় ২.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র তিন মাসে। একইভাবে ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৭ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের মার্চে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। সে হিসেবে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৮.৬ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গ্রামীণ ভিত্তি।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মূল প্রবৃদ্ধি কেন্ত্রীভূত হচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট আমানতের প্রায় ৮২.৫ শতাংশ এসেছে প্রন্তিক এলাকা থেকে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে গ্রামীণ অঞ্চলে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় প্রায় ৪১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এক বছরে এই খাতে গ্রামীণ আমানত বেড়েছে প্রায় ২০.৯ শতাংশ, যা গ্রামীণ অর্থনীতির দ্রুত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি শক্তিশালী সূচক। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৮৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। তথ্যমতে, হিসাব সংখ্যার দিক থেকেও এজেন্ট ব্যাংকিং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মার্চ ২০২৬ শেষে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি। এটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৬ লাখ ৩১ হাজার বেশি এবং ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় প্রায় ১৭ লাখ ৯৬ হাজার বেশি। এই প্রবৃদ্ধি স্পষ্টভাবে দেখায় যে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দ্রুত আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং নগদনির্ভর অর্থনীতি ধীরে ধীরে ডিজিটাল ও ব্যাংকনির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।
এ ছাড়াও ঋণ প্রবাহের ক্ষেত্রেও এজেন্ট ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে এই চ্যানেলের মাধ্যমে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এক বছরে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৩.৭ শতাংশ এবং তিন মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৩ শতাংশ। একইসঙ্গে ঋণ হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ২৮৬টি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কারণেই ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে গতি এসেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণার উৎপত্তি লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ ব্যাংকিং ধারণা ছড়িয়েছে চিলি, কলম্বিয়া, পেরু ও মেক্সিকোয়। বিস্তৃত হয়েছে কেনিয়াসহ আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে। এই গ্রাহকদের প্রায় ৮৫ শতাংশই গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ- যারা আগে কখনো ব্যাংকের শাখায় যাননি বা যাওয়ার সুযোগ পাননি। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে এখানে। সেটি হলো নারীদের বিশেষত গ্রামীণ নারীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করছে এজেন্ট ব্যাংকিং। গ্রাহকদের একটি বড় অংশই নারী। এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকলেও হয়তো এসব নারী একসময় ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতেন, তবে এতটা দ্রুত গতিতে হতেন না এটা নিশ্চিত। ব্যাংক শাখার স্বল্পতা, দীর্ঘ দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয়ের বাস্তবতায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গ্রামবাংলার মানুষের প্রধান ভরসা। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে জড়ানো, অনুপ্রাণিত করা এ সবই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অবদান। গত কয়েক বছরে যারা ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছেন অর্থাৎ টাকা জমা, উত্তোলন এবং ডিপিএস বা সঞ্চয় করা এর অধিকাংশই হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। হাতের নাগালে যে কেউ চাইলেই ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ শাখা পাবে না, তবে এজেন্ট ব্যাংকগুলো পাচ্ছে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং এখন দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত অতিক্রম করা শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ
নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। মোট কথা এজেন্ট ব্যাংকিং মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। গুরুত্ব অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
"





































