বেনাপোল প্রতিনিধি
তীব্র গরমে স্বস্তির নাম তালের শাঁস, শার্শা-বেনাপোলে বেড়েছে চাহিদা

শেষ জ্যৈষ্ঠের খরতাপে সারা দেশে চলছে দাবদাহ। দূর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। তীব্র গরমে জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থায় একটু স্বস্তি পেতে, শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে যশোরের শার্শা-বেনাপোলে কদর বেড়েছে তালের শাঁসের। কারণ কচি তালের শাঁস যেমন পুষ্টিকর তেমনি প্রশান্তিদায়ক।
গরমের এই সময়ে তালের শাঁস কিনে খাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। চাহিদা বাড়ায় দাম কিছুটা বেশি হলেও তা নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না ক্রেতারা। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও পরিশ্রমী মানুষের কাছে তালের শাঁসের কদর সবচেয়ে বেশি।
শার্শা-বেনাপোলের ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন হাট-বাজারের মোড়ে বিক্রেতারা এখন হরদমে বিক্রি করছে তাল শাঁস। এছাড়াও ভ্যান যোগে ভ্রাম্যমান তাল শাঁস বিক্রেতাদের সংখ্যাও কম নয়। উপজেলায় প্রায় শতাধিক পরিবারের লোকজন তাল শাঁস বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক ক্রেতাই পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে প্রতিটি তাল শাঁস ৫-৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৌসুমী ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার জানান, ৩টি গাছের তাল ৪ হাজার টাকায় কিনেছেন। গাছ থেকে তাল নামাতে ২ জন শ্রমিককে দিতে হয়েছে ১ হাজার টাকা আর ভাড়া লেগেছে ২০০ টাকা। বেনাপোল বাজারে সড়কের পাশে প্রতিটি তাল বিক্রি করেন ১৫ থেকে ২৫ টাকা। পেশায় পেয়ারা ব্যবসা করলেও এটি মৌসুমী ব্যবসা। তিনি জানান, এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত তালশাঁস বিক্রি করা যাবে। এই এক দেড় মাসে তিনি তালের শাঁস বিক্রি করে আয় করবেন ২০/৩০ হাজার টাকার মতো।
নাভারন, বাগআঁচড়ার সালাউদ্দিন ও আশিকুর জানায়, চলতি মৌসুমে তালের ফলন কম হওয়ায় উপজেলার সর্বত্রই তাল শাঁসের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে চড়া মূল্যে এ মৌসুমে তাল শাঁস বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রতিটি তাল ১৫ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে তারা প্রতি দিন ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা আয় করছেন। সৌখিন ক্রেতা থেকে শুরু করে স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীরা প্রচন্ড গরমে একটু শান্তির পরশ পেতে ভিড় করছেন তাল শাঁস বিক্রেতাদের কাছে। তারা আরো বলেন, প্রতিবছর মধু মাসে তারা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে পাইকারি দরে তাল শাঁস ক্রয় করে এসব হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকে। পরিশ্রম একটু বেশি হলেও লাভ বেশ ভালোই হয়।
তালের শাঁস বিক্রেতা পৌর এলাকার আব্দুস সামাদ জানান, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কচি তালের গাছের ফল কিনে সংগ্রহ করেন তিনি। তালের সংখ্যা ও আকার ভেদে একটি গাছের তালের দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। প্রতি পিস তাল পাইকারিতে ৫ থেকে ৭ টাকা এবং খুচরায় ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিদিন পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার তালের শাঁস বিক্রি করেন বলে জানান তিনি।
আরেক বিক্রেতা আনিছুর রহমান বলেন, এই মৌসুমে প্রায় শতাধিক মৌসুমি শ্রমিক তালের শাঁস বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক ক্রেতা নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ক্রেতা আরিফ বলেন, তালের শাঁস মৌসুমি ও সুস্বাদু একটি ফল। তাই প্রতি বছরই এই সময় শাঁস খাওয়ার চেষ্টা করি। আজ মেয়ের জন্য তালের শাঁস কিনতে এসেছি।
স্থানীয়দের মতে, প্রাকৃতিকভাবে শীতল, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর হওয়ায় গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে তালের শাঁস মানুষের কাছে এক অনন্য প্রশান্তির উৎস হয়ে উঠেছে। ফলে তাড়াশের বাজারগুলোতে দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদা ও বেচাকেনা। একসময় শার্শা-বেনাপোলের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ তালগাছ ছিল। প্রতিবছর বয়স্ক শত শত তালগাছ কেটে গৃহস্থালি, ইট পোড়ানো, তালের ডোঙ্গা তৈরি ও জ্বালানিসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া, অজ্ঞাত রোগ, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু তালগাছ অকালে মারা যাচ্ছে। আবার আর্থিক অনটনের কারণে অনেক তালগাছের মালিক তাদের তালগাছগুলো সস্তায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। জীববৈচিত্র রক্ষায় এই গাছ সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, চলতি মৌসুমে তালের ফলন কম হওয়ায় বিক্রেতাদের আনা মৌসুমী ফল তাল শাঁস মুহুর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। গ্রীষ্মকালে তাল পাখার বাতাস গ্রামের মানুষের শরীরে যেমন হিমেল পরশ বুলিয়ে দেয়। তেমনি ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাড়িঘর ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তাল গাছের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাল গাছের অভাবে এখন আর চোখে পড়েনা বাবুই পাখির বাসা। পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ অঞ্চলে তালগাছ এখন বিলুপ্ত প্রায়। ফলে, ঐতিহ্যবাহী তালের রস, তালের গুড় ও তালের পাটালি এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।
পিডিএস/এমএইউ









































